বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সংস্কৃতি সভ্যতার ভিত্তি আর অপসংস্কৃতি বিবেকের দরজায় তালা লাগায়।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে ‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন।
সামাজিক সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি লায়ন আনোয়ারা বেগম নিপার সভাপতিত্বে ও মঞ্জুর হোসেন ইসার সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী, তাশিক আহমেদ, কামরুল হাসান দর্পণ, এম এ সায়েম মাসুম, সিদ্দিক আল মামুন, কাদের মনসুর, আকতার হোসেন, মোল্লা নাসির হোসেন বক্তব্য দেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কৃতি হচ্ছে সুন্দরের সাধনা।
সংস্কৃতি সভ্যতার ভিত্তি। সভ্যতা সংস্কৃতির উন্নত রূপ। যখন সভ্যতা ছিল না, তখন সংস্কৃতি ছিল। সংস্কৃতি সুন্দরের পথ দেখায় আর অপসংস্কৃতি মানুষকে অসুন্দরের পথে নিয়ে যায়, অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
অপসংস্কৃতি জাতীয় মূল্যবোধকে গলা টিপে হত্যা করে, বিবেকের দরজায় কড়া লাগায়। অপসংস্কৃতি মানুষকে তার মা, মাটি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে নেয় অপসংস্কৃতির চমক মরীচিকার মতো।’
তিনি বলেন, ‘তরুণরা অপসংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে। তার কারণ এতে চমক আছে উত্তেজনা আছে আর আছে ক্ষণিক আনন্দ।
এর একটা মোহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ হলো সেই দেশের তরুণ সমাজ। অপসংস্কৃতির হিংস্র ছোবলে এ তরুণ সমাজ যদি বিপথগামী হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। পশ্চিমা চটকদার সংস্কৃতি আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ফলে আমরা আমাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ক্রমেই সাংস্কৃতিক দৈন্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের সভ্যতা ও কৃষ্টি কেমন ঐতিহ্যমণ্ডিত, তা তার সংস্কৃতির স্বরূপেই বোঝা যায়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যখন দূষিত হয়, তখনই জাতির অধঃপতন শুরু হয়। জাতীয় জীবনে দেখা দেয় পরাণুকৃতি, অনৈক্য, বিভেদ, বিশৃঙ্খলা—এককথায় সার্বিক অবনতি। একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পেছনে নিয়ামক থাকে সংস্কৃতি। আজকের সময়ে একটি দেশের রাজনৈতিক, ভাষা-কৃষ্টি, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা কবজা করার জন্য তলোয়ার উঁচিয়ে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে না, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই যথেষ্ট।’
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে সংস্কৃতির চাবিকাঠি করপোরেট বেনিয়াদের হাতে চলে গেছে। তারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে মিডিয়ার মাধ্যমে খেয়ালখুশিমতো বাণিজ্যকে সংস্কৃতির উপকরণ বলে প্রচার-প্রচারণা চালায়। মিডিয়ার বদৌলতে ফুলে-ফেঁপে তা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত অপসংস্কৃতির প্লাবন বইয়ে দেয়।’
বিশ্বায়নের এ যুগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আসবেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিনদেশি ছায়াছবি, ভিনদেশি গান বাজবেই। তাই বলে চোখ বুজে, কানে তুলো দিয়ে থাকা যাবে না। ‘কান পাতলেই অভাবিতের দেখা মেলে, মুখ খুললে কেবল ভাবিতের প্রকাশ। ভোগবাদী মতবাদ ঝড়ের মতো এসে জীবনের সব মুকুল ঝরিয়ে দেয়। সংস্কৃতি ঠিক তার উল্টো, দখিন হাওয়ার মতো জীবনের সব ফুল ফুটিয়ে তোলাই তার কাজ’—মোতাহার হোসেন চৌধুরীর এ বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে লোকজ সংস্কৃতির বিকাশকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে সংস্কৃতি গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। একসময় এ দেশে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পরে জীবিত নারীকে সহমরণের জন্য চিতায় তুলে দেওয়া হতো। শাস্ত্রের বিধান এমন কঠিন ছিল। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাগ্রসর চেতনার মানুষ এই ব্যবস্থা আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন। তাতে শাস্ত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। আলোকিত হয়েছে নারীর জীবন। একসময় বাঙালি মুসলমান ঠিকমতো শিক্ষার মূল্যায়ন করতে পারেনি। তারা ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা বর্জন করেছিল। কিন্তু জীবনযাপনের নানা ধাক্কায় একসময় তারা অনুভব করে এভাবে পিছিয়ে থাকলে অগ্রগতির দৌড়ে এই সমাজ পিছিয়ে থাকবে। সুতরাং শুরু হয় শিক্ষাগ্রহণ। মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য সম্মত করান। এভাবে বাংলার মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে।’
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এ নেতা বলেন, ‘সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে গ্রামকে হৃষ্টপুষ্ট করতে হবে আবহমান ঐতিহ্যের রূপরসে। সঙ্গে নাগরিক সুবিধাও পৌঁছাতে হবে গ্রামীণ জনপদে। তবে গ্রামবাসীকে পুরবাসীর ড্রয়িংরুমের অন্তর্জালে বন্দি করা যাবে না কিছুতেই। ফিরিয়ে আনতে হবে গ্রামের খোলা প্রান্তর, সবুজ খেলার মাঠ। নদী, খাল, বিল, জলাশয়কে দখলমুক্ত করে নাইয়রী আনার, নৌকাবাইচের উপযোগী করতে হবে। লোকনৃত্য, জারি- সারি, আউল-বাউল, মুর্শিদী, ভান্ডারী, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, লোকগীতি, ফোক ও ফোকলোর, লালনগীতি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রগীতি, হাসন রাজার গান হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।। নতুন প্রজন্মকে মুঠোফোনের ঝাঁজালো রশ্মি থেকে ফিরিয়ে এনে দেখাতে হবে সিগ্ধ চাঁদের আলো, শরতের আকাশ, তারা ভরা রাত। ফেরাতে হবে যাত্রাপালা, কবি গানের লড়াই।’
তিনি বলেন, ‘সুস্থ সংস্কৃতির জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলে। এরা একে অন্যের পরিপূরক। সুস্থ সংস্কৃতি চাইলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমেই আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব। মনে রাখবেন অপশক্তিকে প্রতিহত করার অন্যতম উপায় হলো সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করি তা যদি দেশকে ভালোবাসতে না শেখায়, জীবনকে প্রেমময় না করে, মানুষের প্রতি দরদি না করে, তাহলে সে শিক্ষা হলো অপশিক্ষা আর অপশিক্ষার পথ ধরে অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে শিকড় গাড়ে।’
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ডে আঘাত এসেছে বার বার। উর্দুকে জাতীয় ভাষা বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন জিন্নাহ। পারেননি। বিগত সরকার আমাদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। পারেনি। ছাত্ররা রুখে দিয়েছে। বাংলা ভাষা, বাক স্বাধীনতা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু চেষ্টা যে চলছে না, তা কিন্তু নয়। সংস্কৃতির একটা নিজস্ব শক্তি আছে। কী সেই শক্তি তা আমরা ৫২, ৬৯, ৭০, ৭১-এ দেখেছি। দেখেছি ৯০ এবং ২০২৪-এও।’
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “আসলে আমরা নিজস্ব সত্তা ও স্বাতন্ত্র্য যে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য গ্রামীণ মেলা এখন আর আগের মতো বসে না। পুতুল নাচ, যাত্রাপালা, জারি-সারি-ভাটিয়ালি গানের দিন শেষ। গ্রামীণ খেলা, দাঁড়িয়াবাঁধা, গোল্লাছুট, কানামাছি, হা-ডু-ডু, লাঠিখেলা গ্রামীণ জনপদে তেমন একটা দেখা যায় না। নদীতে পালতোলা নৌকা এখন আর চোখে পড়ে না। ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’—এ গান এখন আর কেউ গায় না। নদী এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা দখল করে নিয়েছে। আর নদীর স্বচ্ছ পানি দখল করে নিয়েছে নাগরিক বর্জ্য। রাখাল গরুর পাল নিয়ে আর মাঠে যায় না। গ্রামীণ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে দখল করে নিয়েছে নগর। যে নগর পশ্চিমা সংস্কৃতির আবহে উচ্ছ্বসিত ও ভারাক্রান্ত। এমন অবস্থায় একদিনের জন্য বাঙালি হয়ে হৈচৈ বাঁধিয়ে দেয়। এর নাম কি মনেপ্রাণে বাঙালি হওয়া? আমরা মুখে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার কথা বলি কিন্তু কাজে উল্টো। আমরা যারা বাঙালি সংস্কৃতির ধ্বজাধারী বলে জাহির করি, তারা কিন্তু বাঙালি খাবার খাই না, জীবনাচরণেও বাঙালিপনা ফুটে ওঠে না। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াই; যার কারিকুলামে বাঙালি, বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের কোনো গন্ধ নেই।”
তিনি বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে। এ ধরনের স্ববিরোধী সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে কি আমরা খুব বেশি দূর এগোতে পারব? শিকড়ের সন্ধান একদিন আমাদের করতেই হবে। ফিরে যেতে হবে শিকড়ের টানে। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ, যা জীবনাচরণে ফুটে ওঠে। এটা নিরন্তর চর্চার বিষয়। মুখে এক আর কাজে অন্য—এভাবে আর যাই হোক বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকে বেশি দূর এগিয়ে নেয়া যাবে না।
সংস্কৃতি এখন আর মানুষের হাতে নেই। এটা চলে গেছে বেনিয়াদের হাতে।চলচ্চিত্র ও টিভি মিডিয়া তো বেনিয়াদের হাতে পুরোপুরি চলে গেছে।এরা ব্যবসায়ী চিন্তাভাবনা আর স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধারে সর্বত্র সংস্কৃতির ওপর লাঠি ঘোরাচ্ছে। তারা যা দেখাতে চায় তাই তো দেখছে সবাই।যদি নাটক ইন্ডাস্ট্রির কথা বলি তাহলে বলব, তাড়াহুড়ো করে একগাদা নাটক নির্মিত হচ্ছে এ সময়ে। অভিনয় না শিখে আসা কিছু শিল্পীকে নাটকে যুক্ত করা হচ্ছে। অশ্লীল ভাষা ও অঙ্গভঙ্গির নাটক নির্মাণ করা হচ্ছে। ভাষাকে বিকৃত করে আজগুবি ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। ভালো কনটেন্ট খুবই কম; একই রকম গল্প। দায়সারা কাজ। ফলে ভালো নাটক দেখা থেকে দর্শক বঞ্চিত হচ্ছে। ভিউ দিয়ে জনপ্রিয়তা কাউন্ট করা হচ্ছে। দিনকে দিন সিনিয়র চরিত্রের কাটছাঁট করা হচ্ছে। আর সব কিছু নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগকারী নিয়ন্ত্রণ করছেন।’
তিনি হতাশা নিয়ে বলেন, ‘বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার ঘরের কাজের লোকটিও আমাদের দেশের নাটক-সিনেমা দেখে না। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলে, এসব নাটক-সিনেমা দেখতে তাদের ভালো লাগে না। তারা বলে হিন্দি সিরিয়াল বা ভারতের জি বাংলার সিরিয়াল দেখতে তাদের ভালো লাগে। এই যে বিদেশি কনটেন্ট আমাদের দেশে অবাধে প্রবেশ করছে, কারো যেন কিছুই বলার নেই। ভালো সিনেমা বা নাটক বানাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নেই, তাহলে কিভাবে আগ্রাসন রোধ করবেন?’

























