বিষয়ঃ আদালতে আসামি আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য, অপমানজনক আচরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের জোর দাবি।
মাননীয় মহোদয়,
অত্যন্ত দুঃখ, ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের দেশে কারাগার থেকে আদালতে আসামি আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চরম বৈষম্য, অমানবিকতা ও অসম আচরণ চলে আসছে। একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও একজন আসামির সঙ্গে আরেকজন আসামির আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে করা হয়। কাউকে দড়ি দিয়ে গরুর মতো বেঁধে আনা হয়, কাউকে হাতকড়া পরানো হয়, আবার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতাকে কোনো ধরনের হাতকড়া ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
এই দৃশ্য শুধু একজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটি দেশের সংবিধান, মানবাধিকার ও আইনের সমতার নীতির জন্যও অত্যন্ত লজ্জাজনক। একজন গরিব মানুষ কি মানুষ না? একজন অসহায় ব্যক্তি কি সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে না? কেন শুধু অর্থ, ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন ব্যক্তি বিশেষ সুবিধা পাবে, আর একজন গরিব মানুষকে প্রকাশ্যে দড়ি দিয়ে অপমানজনকভাবে হাঁটানো হবে?
বাস্তবে দেখা যায়—
গরিব ও সাধারণ মানুষকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আদালতে আনা হয়;
ধনী ও প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় নমনীয় আচরণ করা হয়;
রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অনেককে হাতকড়া ছাড়াই চলাফেরার সুযোগ দেওয়া হয়;
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন আচরণ করা হয় যেন তারা মানুষ নয়, ভয়ংকর কোনো অপরাধী বা পশু। একজন মানুষ আদালতে বিচারাধীন থাকলেই তার মানবিক মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না। বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধীর মতো অপমান করা ন্যায়বিচারের নীতির বিরোধী। একজন মানুষ অপরাধী কি নির্দোষ— সেটি আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গরিব মানুষের ক্ষেত্রে আগেই তাকে সমাজের সামনে হেয় ও অপমান করা হয়।
দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রকাশ্যে আনা–নেওয়া শুধু একজন ব্যক্তির নয়, তার পরিবার, সন্তান ও সামাজিক সম্মানকেও আঘাত করে। একজন শিশুর কাছে তার বাবাকে দড়ি দিয়ে টেনে নেওয়ার দৃশ্য কতটা কষ্টের হতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়। একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রে এমন দৃশ্য কখনো কাম্য হতে পারে না।
বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে— আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। সেখানে ধনী–গরিব, নেতা–সাধারণ মানুষ কিংবা ক্ষমতাবান–অসহায়ের জন্য আলাদা আইন থাকার কথা নয়। যদি নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে সেটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। আর যদি কাউকে সম্মান দিয়ে আদালতে আনা যায়, তাহলে অন্য কাউকে অপমান করার অধিকার কারও নেই। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়,
আজ দেশের সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করছে—
গরিব হওয়াই কি সবচেয়ে বড় অপরাধ?
টাকা ও ক্ষমতা থাকলে কি আইনের আচরণও বদলে যায়?
মানুষের সম্মান কি শুধু ধনীদের জন্য?
একই দেশের নাগরিক হয়েও কেন একজন মানুষ সম্মান পাবে, আরেকজন অপমানিত হবে?
আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপমান করা নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা, মানুষের মর্যাদা ভেঙে দেওয়া নয়।
অতএব, দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি—
১। আদালতে আসামি আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন ও মানবিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
২। কোনো ব্যক্তিকে অপমানজনকভাবে দড়ি দিয়ে বেঁধে জনসম্মুখে আনা–নেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক। ৩। ধনী, গরিব, রাজনৈতিক নেতা বা সাধারণ মানুষ— সকলের জন্য একই আইন কার্যকর করা হোক।
৪। মানবাধিকারবিরোধী ও বৈষম্যমূলক আচরণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
৫। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মানবিক আচরণ ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হোক।
৬। বিচার শেষ হওয়ার আগে কোনো নাগরিককে এমনভাবে উপস্থাপন না করা হোক যাতে তার সামাজিক সম্মান নষ্ট হয়।
৭। আদালত প্রাঙ্গণ ও কারাগার পরিবহনে মানবাধিকারসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হোক।
মাননীয় মহোদয়,
একটি সভ্য, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে আইনের প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। গরিব মানুষকে অপমান করে আর প্রভাবশালীদের বিশেষ সম্মান দিয়ে কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষের মর্যাদা তার অর্থ বা ক্ষমতা দিয়ে নয়, তার নাগরিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে নির্ধারিত হবে। আপনার মানবিক ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
বিনীত
বরাবর সালাহউদ্দিন আহমদ মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা
-
, দীপক শর্মা ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি
- আপডেট সময় : ১১:২৪:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
- 92
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ




















