ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিয়ের খুতবায় দাম্পত্য জীবনের পাথেয়

বিয়ের খুতবায় দাম্পত্য জীবনের পাথেয়

মুসলিম বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো বিয়ের খুতবা। সাধারণত বিয়েতে খুতবা পড়া হয়, কিন্তু অনেকেই জানে না বিয়েতে খুতবা পড়ার বিধান কী, তা শোনা আবশ্যক কি না এবং তাতে কী পাঠ করা হয়? নিম্নে বিয়ের খুতবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

বিয়ের সময় খুতবা পড়ার বিধান

বিয়ের মজলিসে খুতবা পাঠ করা সুন্নত। আর খুতবা শোনা ওয়াজিব। তাই খুতবার সময় কথাবার্তা বলা এবং হৈচৈ করা খুবই অনুচিত কাজ।

বিয়ের খুতবার প্রচলন

ইসলাম-পূর্ব আরবেও বিয়ের আগে খুতবা পড়ার প্রচলন ছিল। এই খুতবায় তারা নিজে গোত্র, বংশের মর্যাদা ও গুণকীর্তন করত। ইসলাম আগমনের পর অন্যান্য বিষয়ের মতো বিয়ের খুতবায় সংস্কার আনা হয়। তাতে যুক্ত করা হয় আল্লাহর প্রশংসা, রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠ, রিসালাতের সাক্ষ্য, কোরআনের নির্বাচিত আয়াত ও নির্বাচিত হাদিসগুলো।

ফলে তা পরিণত হয় স্বামী ও স্ত্রী এবং তাদের উভয়ের পরিবার, পারিবারিক জীবনের জন্য উত্তম নির্দেশনা।

খুতবার বিষয়বস্তু ও তার গুরুত্ব

সমাজে বহুল প্রচলিত বিয়ের খুতবার বক্তব্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হলো। বিয়ের খুতবার বিষয়বস্তুকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। তা হলো—১. সূচনা ভাগ, ২. কোরআনের আয়াত, ৩. হাদিস বা সুন্নাহ।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

সূচনা ভাগ

বিয়ের খুতবার সূচনা ভাগে সাধারণত আল্লাহর প্রশংসা, রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠ এবং ঈমানের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে যে খুতবাগুলো সবচেয়ে বেশি পাঠ করা হয় তাতে সাধারণত আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য এবং মাহাত্ম্য ও বড়ত্ব ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালতের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। আর এ দুটি বিষয় ঈমানের মূল স্তম্ভ। পাশাপাশি আল্লাহর ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ ও আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, যা পার্থিব জীবনে মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্বল।

বিশেষত নবদম্পতি, যারা একটি নতুন জীবনে পদার্পণ করছে, তাদের জীবন সুন্দর ও সুখময় হওয়ার জন্য আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ একান্ত প্রয়োজন।

কোরআনের আয়াত

বিয়ের খুতবায় সাধারণত তিনটি আয়াত পাঠ করা হয়। তিনটি আয়াতেই তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহভীতি তথা পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির ভয় না থাকলে দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাস ও সততা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আল্লাহর ভয় ও পুরস্কারের আশা না থাকলে দাম্পত্য জীবনে ত্যাগ স্বীকার করাও সম্ভব হয় না। নিম্নে আয়াত তিনটি ও তার বিষয়বস্তু নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো—

প্রথম আয়াত ও তার শিক্ষা : আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ কোরো না।’

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)

এই আয়াতে আল্লাহ মৃত্যুর আগে আদর্শ মুমিন ও মুসলমান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ তোমার শেষ পরিণতি যেন সুন্দর হয় তা নিয়ে ভাবো। এই বিয়ের খুতবায় এই আয়াত পাঠ করার মাধ্যমে নবদম্পতিকে এই বার্তাও দেওয়া হয় যে তোমরা বাহ্যিক উন্নতির পরিবর্তে পরকালীন জীবনের পাথেয় অর্জনে মনোযোগী হবে।

দ্বিতীয় আয়াত ও তার শিক্ষা : আল্লাহর বাণী, ‘হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তা থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাদের দুই থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা করো এবং সতর্ক থাকো জ্ঞাতি-বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)

এই আয়াতে মানবজাতির ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটি পাঠ করে নব দম্পতি বোঝানো হয় যে এখন তোমরা বিয়ের মাধ্যমে মানবসভ্যতা বিকাশের যে পরম্পরা তোমরা তার অংশীদার হলে। আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে বলা হয়েছে। নবদম্পতি তথা বধূ ও বর উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তাদের জীবনে আত্মীয়তার নতুন শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে।

তৃতীয় আয়াত ও তার শিক্ষা : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো; তা হলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’

(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৭০-৭১)

এই আয়াতে আল্লাহ সহজ-সরল ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বামী ও স্ত্রী সারা জীবন এক সঙ্গে বসবাস করে। তারা যদি তাদের কথাবার্তায় সংযত না হয়, তবে দীর্ঘ জীবন একসঙ্গে কাটানো কঠিন হয়ে যায়। আর যদি সবাই মুখের ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তাদের দাম্পত্য জীবন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক মধুর হয়।

হাদিসের বর্ণনা

বিয়ের খুতবায় চার-পাঁচটি হাদিস পাঠ করা হয়। এসব হাদিসে বিয়ের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, উদ্দেশ্য ও আদর্শ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। নিম্নে হাদিসগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো—

প্রথম হাদিস ও তার শিক্ষা : বিয়ের খুতবায় পঠিত প্রথম হাদিসটি হলো, ‘বিয়ে আমার সুন্নত থেকে। যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের ওপর আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৪৬)

হাদিসে বিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং বিয়েবিমুখ মানুষদের সতর্ক করা হয়েছে।

দ্বিতীয় হাদিস ও তার শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে আর যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, রোজা তার যৌনতাকে দমন করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৬)

হাদিসে নবীজি (সা.) সমগ্র যুব সম্প্রদায়কে বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার বর্ণনা করেছেন। তা হলো দৃষ্টির হেফাজত এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত। দৃষ্টির হেফাজত হলো যৌবনের তাড়না যুবক-যুবতির মনে যে অস্থিরতা তৈরি করে এবং মনকে বিক্ষিপ্ত করে রাখে তা থেকে হেফাজত। আর লজ্জাস্থানের হেফাজত হলো চারিত্রিক স্খলন থেকে আত্মরক্ষা। অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা ও চারিত্রিক স্খলন যুবসমাজকে জীবন ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তৃতীয় হাদিস ও তার শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। তা যদি না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)

আলোচ্য হাদিসে নবীজি (সা.) পাত্র ও পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিনদারি ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বিয়ের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় বিবেচনা করতে বলেছেন, সম্পদ, বংশ পরিচয়, সৌন্দর্য ও দ্বিনদারি। এর ভেতর তিনি দ্বিনদারিকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বিয়ের খুতবায় দাম্পত্য জীবনের পাথেয়

আপডেট সময় : ০৯:০৭:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মুসলিম বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো বিয়ের খুতবা। সাধারণত বিয়েতে খুতবা পড়া হয়, কিন্তু অনেকেই জানে না বিয়েতে খুতবা পড়ার বিধান কী, তা শোনা আবশ্যক কি না এবং তাতে কী পাঠ করা হয়? নিম্নে বিয়ের খুতবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

বিয়ের সময় খুতবা পড়ার বিধান

বিয়ের মজলিসে খুতবা পাঠ করা সুন্নত। আর খুতবা শোনা ওয়াজিব। তাই খুতবার সময় কথাবার্তা বলা এবং হৈচৈ করা খুবই অনুচিত কাজ।

বিয়ের খুতবার প্রচলন

ইসলাম-পূর্ব আরবেও বিয়ের আগে খুতবা পড়ার প্রচলন ছিল। এই খুতবায় তারা নিজে গোত্র, বংশের মর্যাদা ও গুণকীর্তন করত। ইসলাম আগমনের পর অন্যান্য বিষয়ের মতো বিয়ের খুতবায় সংস্কার আনা হয়। তাতে যুক্ত করা হয় আল্লাহর প্রশংসা, রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠ, রিসালাতের সাক্ষ্য, কোরআনের নির্বাচিত আয়াত ও নির্বাচিত হাদিসগুলো।

ফলে তা পরিণত হয় স্বামী ও স্ত্রী এবং তাদের উভয়ের পরিবার, পারিবারিক জীবনের জন্য উত্তম নির্দেশনা।

খুতবার বিষয়বস্তু ও তার গুরুত্ব

সমাজে বহুল প্রচলিত বিয়ের খুতবার বক্তব্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হলো। বিয়ের খুতবার বিষয়বস্তুকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। তা হলো—১. সূচনা ভাগ, ২. কোরআনের আয়াত, ৩. হাদিস বা সুন্নাহ।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

সূচনা ভাগ

বিয়ের খুতবার সূচনা ভাগে সাধারণত আল্লাহর প্রশংসা, রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠ এবং ঈমানের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে যে খুতবাগুলো সবচেয়ে বেশি পাঠ করা হয় তাতে সাধারণত আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য এবং মাহাত্ম্য ও বড়ত্ব ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালতের সাক্ষ্য দেওয়া হয়। আর এ দুটি বিষয় ঈমানের মূল স্তম্ভ। পাশাপাশি আল্লাহর ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ ও আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, যা পার্থিব জীবনে মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্বল।

বিশেষত নবদম্পতি, যারা একটি নতুন জীবনে পদার্পণ করছে, তাদের জীবন সুন্দর ও সুখময় হওয়ার জন্য আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ একান্ত প্রয়োজন।

কোরআনের আয়াত

বিয়ের খুতবায় সাধারণত তিনটি আয়াত পাঠ করা হয়। তিনটি আয়াতেই তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহভীতি তথা পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির ভয় না থাকলে দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাস ও সততা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আল্লাহর ভয় ও পুরস্কারের আশা না থাকলে দাম্পত্য জীবনে ত্যাগ স্বীকার করাও সম্ভব হয় না। নিম্নে আয়াত তিনটি ও তার বিষয়বস্তু নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো—

প্রথম আয়াত ও তার শিক্ষা : আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ কোরো না।’

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)

এই আয়াতে আল্লাহ মৃত্যুর আগে আদর্শ মুমিন ও মুসলমান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ তোমার শেষ পরিণতি যেন সুন্দর হয় তা নিয়ে ভাবো। এই বিয়ের খুতবায় এই আয়াত পাঠ করার মাধ্যমে নবদম্পতিকে এই বার্তাও দেওয়া হয় যে তোমরা বাহ্যিক উন্নতির পরিবর্তে পরকালীন জীবনের পাথেয় অর্জনে মনোযোগী হবে।

দ্বিতীয় আয়াত ও তার শিক্ষা : আল্লাহর বাণী, ‘হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তা থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাদের দুই থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা করো এবং সতর্ক থাকো জ্ঞাতি-বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)

এই আয়াতে মানবজাতির ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটি পাঠ করে নব দম্পতি বোঝানো হয় যে এখন তোমরা বিয়ের মাধ্যমে মানবসভ্যতা বিকাশের যে পরম্পরা তোমরা তার অংশীদার হলে। আয়াতে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে বলা হয়েছে। নবদম্পতি তথা বধূ ও বর উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তাদের জীবনে আত্মীয়তার নতুন শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে।

তৃতীয় আয়াত ও তার শিক্ষা : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো; তা হলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’

(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৭০-৭১)

এই আয়াতে আল্লাহ সহজ-সরল ও সঠিক কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বামী ও স্ত্রী সারা জীবন এক সঙ্গে বসবাস করে। তারা যদি তাদের কথাবার্তায় সংযত না হয়, তবে দীর্ঘ জীবন একসঙ্গে কাটানো কঠিন হয়ে যায়। আর যদি সবাই মুখের ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তাদের দাম্পত্য জীবন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক মধুর হয়।

হাদিসের বর্ণনা

বিয়ের খুতবায় চার-পাঁচটি হাদিস পাঠ করা হয়। এসব হাদিসে বিয়ের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, উদ্দেশ্য ও আদর্শ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। নিম্নে হাদিসগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো—

প্রথম হাদিস ও তার শিক্ষা : বিয়ের খুতবায় পঠিত প্রথম হাদিসটি হলো, ‘বিয়ে আমার সুন্নত থেকে। যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের ওপর আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৪৬)

হাদিসে বিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং বিয়েবিমুখ মানুষদের সতর্ক করা হয়েছে।

দ্বিতীয় হাদিস ও তার শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে আর যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, রোজা তার যৌনতাকে দমন করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৬)

হাদিসে নবীজি (সা.) সমগ্র যুব সম্প্রদায়কে বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার বর্ণনা করেছেন। তা হলো দৃষ্টির হেফাজত এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত। দৃষ্টির হেফাজত হলো যৌবনের তাড়না যুবক-যুবতির মনে যে অস্থিরতা তৈরি করে এবং মনকে বিক্ষিপ্ত করে রাখে তা থেকে হেফাজত। আর লজ্জাস্থানের হেফাজত হলো চারিত্রিক স্খলন থেকে আত্মরক্ষা। অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা ও চারিত্রিক স্খলন যুবসমাজকে জীবন ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তৃতীয় হাদিস ও তার শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। তা যদি না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)

আলোচ্য হাদিসে নবীজি (সা.) পাত্র ও পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিনদারি ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বিয়ের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় বিবেচনা করতে বলেছেন, সম্পদ, বংশ পরিচয়, সৌন্দর্য ও দ্বিনদারি। এর ভেতর তিনি দ্বিনদারিকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।