ঢাকা ০৫:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র ইসরা ও মেরাজের ১০ শিক্ষা

পবিত্র ইসরা ও মেরাজের ১০ শিক্ষা

ইসলামী ইতিহাসে রজব মাস রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের ঘটনার জন্য সুপরিচিত। বিভিন্ন গ্রন্থে  মেরাজের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে এসেছে। মুমিনের জন্য এই ঘটনায় বহু শিক্ষার উপকরণ বিদ্যমান আছে। তাই এর থেকে উপকৃত হতে হলে একে শুধু গল্প হিসেবে নয়, বরং জীবন পরিচালনার পথনির্দেশক হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

মেরাজ থেকে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো—

এক : আল্লাহর ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা

আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যে এত দীর্ঘ এক সফর সম্পন্ন করিয়েছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আসমান ভ্রমণ, নবীগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য অবলোকন, আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন এবং নামাজের উপহার নিয়ে ফিরে আসা—সব কিছুই চোখের পলকে সম্পন্ন হয়েছে।

এখান থেকে যে শিক্ষাটি পাওয়া যায়, তা হলো—যখন কোনো বিষয় কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় তখন মানুষের বুদ্ধি তা গ্রহণ করুক বা না করুক, মুমিন হিসেবে তা মেনে নেওয়া আবশ্যক।

দুই : কষ্টের পরই স্বস্তি আছে

মেরাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কষ্টের পরই স্বস্তি আসে।

নবীজি (সা.) দাওয়াতের শুরু থেকেই নানাবিধ বিপদ-আপদ, নির্যাতন ও কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সাহাবিদের ওপর জুলুম, সামাজিক বয়কট, শেআবে আবি তালিবে তিন বছরের অবরুদ্ধ জীবন, তায়েফে পাথর নিক্ষেপ এবং মক্কার মুশরিকদের নিরন্তর কষ্ট প্রদান—সব কিছুর পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সান্ত্বনার নিদর্শন হিসেবে মেরাজের ঘটনা দ্বারা সম্মানিত করেন। এতে বোঝা হয়, মানুষ যদি নবীর জন্য জমিনের পথ বন্ধ করে দেয়, তবে আল্লাহ তাঁর জন্য আসমানের পথ উন্মুক্ত করে দেন। জমিনবাসী যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আসমানবাসী তাঁকে স্বাগত জানায়।

তাই হকের ওপর থাকা সত্ত্বেও যখন আমাদের ওপর বিপদ আসে তখন আল্লাহর সঙ্গই আমাদের সাফল্যের জন্য যথেষ্ট।

তিন. বিপদ-আপদ চিরস্থায়ী নয়

মেরাজের ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষাও পাই যে যেভাবে রাতের অন্ধকার চিরকাল থাকে না, তেমনি বিপদ-আপদ ও দুঃখকষ্টও সারা জীবন থাকে না। দুনিয়ার দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, দুশ্চিন্তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনোই স্থায়ী হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন তায়েফবাসী কষ্ট দিয়েছিল এবং তিনি চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখনই আল্লাহ তাআলা তাঁকে আরশে আজিমে ডেকে নিয়ে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।

(সুরা : আল-ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)

চার. যেকোনো কাজের শুরুতে কষ্টের সম্মুখীন হওয়া

এ ঘটনা থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে দ্বিনের কাজের শুরুতে কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হওয়া সুনিশ্চিত। যাঁরা দ্বিনের কাজ করেন তাঁদের এই মানসিকতা তৈরি করে নেওয়া উচিত যে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা নবীদের কাছ থেকে যেমন ইলম ও আমল পেয়েছি, তেমনি তাঁদের উত্তরাধিকার হিসেবেই আমাদের ওপর বিপদ-আপদ আসবে এবং জখমে জর্জরিত হতে হবে। লোকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘হে বৎস! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয় এটি অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’

(সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৭)

পাঁচ. নিরাশ হবেন না

তায়েফে যখন পাথর মেরে নবীজির শরীর রক্তাক্ত করা হয়েছিল, সেই কঠিন সময়েও শত্রুকে অভিশাপ না দিয়ে দোয়া করেছেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছেন। তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি, নিজের লক্ষ্য থেকে পিছপা হননি এবং পরিস্থিতির কারণে মনঃক্ষুণ্নও হননি। বরং তিনি আপন মিশনে অবিচল থেকে মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দিতে থাকলেন এবং প্রতিটি বিপদ সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করলেন।

এ থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, আপনি যদি সত্যের ওপর অটল থাকেন, তবে সাফল্য অবশ্যই আপনার পদচুম্বন করবে এবং পথের সব বাধা নিজে থেকেই দূর হয়ে যাবে।

ছয়. দুনিয়া হলো কষ্টের জায়গা

মেরাজের ঘটনা এই বিষয়েরও ইঙ্গিত দেয় যে দুনিয়া হলো দুঃখকষ্টের জায়গা। এখানে মানুষকে পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজে যাওয়ার আগে দুনিয়ার জীবনে ধাপে ধাপে নানা কষ্টের মোকাবেলা করেছেন। এর বিপরীতে ঊর্ধ্বজগৎ ও পরকালই মুমিনের প্রকৃত শান্তির স্থান। তাই এই দুঃখের আবাসে আসা বিপদ-আপদে মনঃক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়। এখানকার কয়েক দিনের কষ্ট সহ্য করে যদি দ্বিনের ওপর অটল থাকা যায়, তবে চিরস্থায়ী সুখ ও আরাম অর্জিত হবে।

সাত. তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি উপায়-উপকরণ অবলম্বন

মসজিদুল আকসায় পৌঁছানোর পর জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সওয়ারিটিকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধেছিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।

তবে মাধ্যমের ওপর ভরসা রেখে মাধ্যম সৃষ্টিকারী আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও ঠিক নয়। মাধ্যম গ্রহণ জরুরি, তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে এই মাধ্যমের ভেতর কার্যকারিতা দান করা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কাজ।

আট. মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা

বায়তুল মামুরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে পানীয় পেশ করা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল মদের পেয়ালা এবং অন্যটি ছিল দুধের পেয়ালা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলেন।

এখান থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা উত্তম, যাতে তিনি তাঁর পছন্দমতো গ্রহণ করতে পারেন।

নয়. অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের থেকে অভিজ্ঞতা গ্রহণ

মেরাজ আমাদের শেখায়—অভিজ্ঞদের থেকে উপকৃত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার পর মুসা (আ.) নবীজিকে মানুষের অসুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে নামাজ কমানোর পরামর্শ দেন। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসা (আ.)-এর প্রতি দোয়া করেন এবং বলেন, ‘নবীদের মধ্যে আমার উম্মতের জন্য তাঁর মতো শুভাকাঙ্ক্ষী কাউকে দেখিনি।’ (তাবারানি)

দশ. শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ার মনোভাব তৈরি করা

মেরাজ গমনের সময় মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় নিতে লাগলেন, তখন মুসা আলাইহিস সালাম কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, আমার পরে প্রেরিত নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

মুসা আলাইহিস সালামের মনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব দেখে ঈর্ষা থাকা সত্ত্বেও তিনি নবীর উম্মতের প্রতি দয়া ও শুভ কামনা প্রদর্শন করেছেন। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ৫০ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে ফিরছিলেন, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে তা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। তাঁর এই আচরণে বোঝা যায়, কারো গুণাবলি বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখে মনে ঈর্ষা জাগলেও তার প্রতি সহানুভূতি ও শুভ কামনা রাখা উচিত।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পবিত্র ইসরা ও মেরাজের ১০ শিক্ষা

আপডেট সময় : ০১:৩২:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ইসলামী ইতিহাসে রজব মাস রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের ঘটনার জন্য সুপরিচিত। বিভিন্ন গ্রন্থে  মেরাজের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে এসেছে। মুমিনের জন্য এই ঘটনায় বহু শিক্ষার উপকরণ বিদ্যমান আছে। তাই এর থেকে উপকৃত হতে হলে একে শুধু গল্প হিসেবে নয়, বরং জীবন পরিচালনার পথনির্দেশক হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

মেরাজ থেকে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো—

এক : আল্লাহর ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা

আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যে এত দীর্ঘ এক সফর সম্পন্ন করিয়েছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আসমান ভ্রমণ, নবীগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য অবলোকন, আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন এবং নামাজের উপহার নিয়ে ফিরে আসা—সব কিছুই চোখের পলকে সম্পন্ন হয়েছে।

এখান থেকে যে শিক্ষাটি পাওয়া যায়, তা হলো—যখন কোনো বিষয় কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় তখন মানুষের বুদ্ধি তা গ্রহণ করুক বা না করুক, মুমিন হিসেবে তা মেনে নেওয়া আবশ্যক।

দুই : কষ্টের পরই স্বস্তি আছে

মেরাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কষ্টের পরই স্বস্তি আসে।

নবীজি (সা.) দাওয়াতের শুরু থেকেই নানাবিধ বিপদ-আপদ, নির্যাতন ও কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সাহাবিদের ওপর জুলুম, সামাজিক বয়কট, শেআবে আবি তালিবে তিন বছরের অবরুদ্ধ জীবন, তায়েফে পাথর নিক্ষেপ এবং মক্কার মুশরিকদের নিরন্তর কষ্ট প্রদান—সব কিছুর পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সান্ত্বনার নিদর্শন হিসেবে মেরাজের ঘটনা দ্বারা সম্মানিত করেন। এতে বোঝা হয়, মানুষ যদি নবীর জন্য জমিনের পথ বন্ধ করে দেয়, তবে আল্লাহ তাঁর জন্য আসমানের পথ উন্মুক্ত করে দেন। জমিনবাসী যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আসমানবাসী তাঁকে স্বাগত জানায়।

তাই হকের ওপর থাকা সত্ত্বেও যখন আমাদের ওপর বিপদ আসে তখন আল্লাহর সঙ্গই আমাদের সাফল্যের জন্য যথেষ্ট।

তিন. বিপদ-আপদ চিরস্থায়ী নয়

মেরাজের ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষাও পাই যে যেভাবে রাতের অন্ধকার চিরকাল থাকে না, তেমনি বিপদ-আপদ ও দুঃখকষ্টও সারা জীবন থাকে না। দুনিয়ার দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, দুশ্চিন্তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনোই স্থায়ী হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন তায়েফবাসী কষ্ট দিয়েছিল এবং তিনি চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখনই আল্লাহ তাআলা তাঁকে আরশে আজিমে ডেকে নিয়ে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।

(সুরা : আল-ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)

চার. যেকোনো কাজের শুরুতে কষ্টের সম্মুখীন হওয়া

এ ঘটনা থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে দ্বিনের কাজের শুরুতে কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হওয়া সুনিশ্চিত। যাঁরা দ্বিনের কাজ করেন তাঁদের এই মানসিকতা তৈরি করে নেওয়া উচিত যে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা নবীদের কাছ থেকে যেমন ইলম ও আমল পেয়েছি, তেমনি তাঁদের উত্তরাধিকার হিসেবেই আমাদের ওপর বিপদ-আপদ আসবে এবং জখমে জর্জরিত হতে হবে। লোকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘হে বৎস! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয় এটি অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’

(সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৭)

পাঁচ. নিরাশ হবেন না

তায়েফে যখন পাথর মেরে নবীজির শরীর রক্তাক্ত করা হয়েছিল, সেই কঠিন সময়েও শত্রুকে অভিশাপ না দিয়ে দোয়া করেছেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছেন। তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি, নিজের লক্ষ্য থেকে পিছপা হননি এবং পরিস্থিতির কারণে মনঃক্ষুণ্নও হননি। বরং তিনি আপন মিশনে অবিচল থেকে মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দিতে থাকলেন এবং প্রতিটি বিপদ সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করলেন।

এ থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, আপনি যদি সত্যের ওপর অটল থাকেন, তবে সাফল্য অবশ্যই আপনার পদচুম্বন করবে এবং পথের সব বাধা নিজে থেকেই দূর হয়ে যাবে।

ছয়. দুনিয়া হলো কষ্টের জায়গা

মেরাজের ঘটনা এই বিষয়েরও ইঙ্গিত দেয় যে দুনিয়া হলো দুঃখকষ্টের জায়গা। এখানে মানুষকে পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজে যাওয়ার আগে দুনিয়ার জীবনে ধাপে ধাপে নানা কষ্টের মোকাবেলা করেছেন। এর বিপরীতে ঊর্ধ্বজগৎ ও পরকালই মুমিনের প্রকৃত শান্তির স্থান। তাই এই দুঃখের আবাসে আসা বিপদ-আপদে মনঃক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়। এখানকার কয়েক দিনের কষ্ট সহ্য করে যদি দ্বিনের ওপর অটল থাকা যায়, তবে চিরস্থায়ী সুখ ও আরাম অর্জিত হবে।

সাত. তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি উপায়-উপকরণ অবলম্বন

মসজিদুল আকসায় পৌঁছানোর পর জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সওয়ারিটিকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধেছিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।

তবে মাধ্যমের ওপর ভরসা রেখে মাধ্যম সৃষ্টিকারী আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও ঠিক নয়। মাধ্যম গ্রহণ জরুরি, তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে এই মাধ্যমের ভেতর কার্যকারিতা দান করা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই কাজ।

আট. মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা

বায়তুল মামুরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে পানীয় পেশ করা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল মদের পেয়ালা এবং অন্যটি ছিল দুধের পেয়ালা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলেন।

এখান থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা উত্তম, যাতে তিনি তাঁর পছন্দমতো গ্রহণ করতে পারেন।

নয়. অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের থেকে অভিজ্ঞতা গ্রহণ

মেরাজ আমাদের শেখায়—অভিজ্ঞদের থেকে উপকৃত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার পর মুসা (আ.) নবীজিকে মানুষের অসুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে নামাজ কমানোর পরামর্শ দেন। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসা (আ.)-এর প্রতি দোয়া করেন এবং বলেন, ‘নবীদের মধ্যে আমার উম্মতের জন্য তাঁর মতো শুভাকাঙ্ক্ষী কাউকে দেখিনি।’ (তাবারানি)

দশ. শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ার মনোভাব তৈরি করা

মেরাজ গমনের সময় মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় নিতে লাগলেন, তখন মুসা আলাইহিস সালাম কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, আমার পরে প্রেরিত নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

মুসা আলাইহিস সালামের মনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব দেখে ঈর্ষা থাকা সত্ত্বেও তিনি নবীর উম্মতের প্রতি দয়া ও শুভ কামনা প্রদর্শন করেছেন। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ৫০ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে ফিরছিলেন, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে তা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। তাঁর এই আচরণে বোঝা যায়, কারো গুণাবলি বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখে মনে ঈর্ষা জাগলেও তার প্রতি সহানুভূতি ও শুভ কামনা রাখা উচিত।