ইতিহাসের সাক্ষী শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে জাপানে নির্মিত প্রথম মসজিদ ঐতিহাসিক কোবে মসজিদ। এটি কোবের সবচেয়ে ব্যস্ত ও জনপ্রিয় পর্যটন এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত। চেক স্থপতি জান জোসেফ সভাগরের নকশায় নির্মিত নজরকাড়া এই মসজিদে ঐতিহ্যবাহী ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়, যেখানে জটিল জ্যামিতিক ও ইসলামিক নকশা সংযোজন করা হয়েছে। তিনতলা ঐতিহাসিক মসজিদটির ওপরে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ এবং আজানের জন্য ব্যবহৃত দুটি মিনার।
ভেতরের ডিজাইনে রয়েছে তুর্কি শিল্পের প্রভাব। সাদামাটা নান্দনিক মিম্বার ও মিহরাব। ঝকঝকে সাদা মার্বেলের দেয়ালে সুসজ্জিত সোনালি লেখা মসজিদটির সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নিচতলার মূল নামাজঘরে একটি ঝলমলে ঝাড়বাতি ঝুলছে, চারপাশে রয়েছে নান্দনিক কাচের জানালা।
মসজিদটিতে নারীদেরও নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে।
মসজিদটিতে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, আর ঈদের মতো মুসলিম উৎসব ও উদযাপনের সময় কোবে ও আশপাশের শহর থেকে অনেক বেশি মানুষ এখানে একত্রিত হয়। মসজিদে বিয়ে ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়।
কোনো অমুসলিম পর্যটক মসজিদ পরিদর্শনে এলে তাদের সব সময় সাদরে গ্রহণ করা হয়।
তবে এ ক্ষেত্রে তাদের শালীন পোশাক পরে মসজিদ এলাকায় প্রবেশ করতে হয়।
ইসলামের আগমন ও নির্মাণের ইতিহাস
কোনো কোনো নথিপত্র মতে, জাপানে ইসলামের চর্চা শুরু হয় ১৭০০ সালের দিকে। সে সময়কার প্রাচীন জাপানি বই-পুস্তকে ইসলাম ও মুসলমানের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে মুসলমানদের সঙ্গে জাপানের প্রকৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয় উনিশ শতকে। ১৮৮৯ সালে উসমানি সুলতান আবদুল হামিদ দ্বিতীয় জাপানে সৌহার্দ্য সফরের জন্য উসমানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এরতুগ্রুল পাঠান।
ফেরার পথে ওয়াকায়ামা প্রদেশের উপকূলে ভয়াবহ ঝড়ে জাহাজটি ডুবে যায়। এতে শত শত নাবিক মারা যান। মাত্র ৯৬ জন নাবিক বেঁচে যান, যাঁদের কোবে শহরে নেওয়া হয় এবং পরে দুটি জাপানি জাহাজে করে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা জাপানিদের মধ্যে তুর্কিদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করে এবং এখান থেকেই তুরস্ক ও জাপানের বন্ধুত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
আবার ১৯০০ সালের দিকে কোবে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। বিদেশি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এই এলাকায় থাকত। ফলে ১৯২৮ সালে মূলত ভারতীয় ব্যবসায়ী ও তুর্কিদের নিয়ে গঠিত বন্দরনগরীর ক্রমবর্ধমান মুসলিম সম্প্রদায় শহরের প্রথম মসজিদ নির্মাণের জন্য অনুদান সংগ্রহ শুরু করে। পরে তারা জাপানের সম্রাটের অনুমতি নিয়ে ১৯৩৫ সালের অক্টোবরে কোবে মসজিদ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে।
কালের আবর্তে জাপানে আরো বড় বড় মসজিদ তৈরি হলেও এই মসজিদকে জাপানের ইতিহাসের একটি অনন্য ও ব্যতিক্রমী অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মসজিদের আরেকটি নাম হলো, মিরাকল মসজিদ বা অলৌকিক মসজিদ। কারণ এই মাটির ওপর বহু ঝড়-ঝাপটা গেলেও মহান আল্লাহর দয়ায় এই মসজিদ এখনো টিকে আছে।
১৯৪৩ সালে জাপানি নৌবাহিনী এই মসজিদ ভবনটি দখল করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোবে শহরে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করে, তখন যে অল্প কয়েকটি ভবন টিকে ছিল, তার মধ্যে কোবে মসজিদ একটি। যুদ্ধের পরও মসজিদ ভবনের কাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি, পুরোপুরি অক্ষত ছিল। ১৯৯৫ সালের গ্রেট হানশিন ভূমিকম্পেও মসজিদটি অক্ষত ছিল। অথচ সেই ভূমিকম্পে ছয় হাজার ৪৩৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এমনকি ১৯৩৮ সালের ভয়াবহ কোবে বন্যায়ও এর কোনো ক্ষতি হয়নি।


























