স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমের দেশগুলোতে চাঁদ আগে দেখা যায়। উদাহরণত সৌদিতে সন্ধ্যা ৭টায় সূর্য ডোবার পর সেখানে চাঁদ দেখা গেল। তার এক ঘণ্টা পর মিসরে সন্ধ্যা হলে সেখানে দেখা যাবে।
সবাই জানে সৌদির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান তিন ঘণ্টা, আর এখানে বলা হলো ২১ ঘণ্টা। এর জবাব হলো—সূর্য আমাদের দেশ থেকে সৌদিতে যেতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আর সৌদি থেকে সূর্য আবার আমাদের দেশে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। ২১ + ৩ = ২৪ ঘণ্টা হয়ে যায়। ঠিক তেমনি চাঁদ সৌদি থেকে আমাদের দেশে, পশ্চিম দিক থেকে ঘুরে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। যদি চাঁদ পূর্ব দিকে ঘুরত, তাহলে তিন ঘণ্টার মধ্যে চলে আসতে পারত। এ কারণেই মূলত সৌদির সঙ্গে বাংলাদেশের চাঁদ দেখায় এক দিনের ব্যবধান হয়ে যায়।
অন্য দেশের চাঁদের খবর গ্রহণ করার শর্তগুলো
সব আলেম কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে এ কথার ওপর একমত যে অন্য দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ সংগ্রহ করা জরুরি নয়। এ ছাড়া এক এলাকার চাঁদ অন্য এলাকায় গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একাধিক শর্ত রয়েছে :
এক. অন্য এলাকা থেকে চাঁদের খবর নির্ভরযোগ্যসূত্রে পৌঁছতে হবে।
দুই. প্রেরিত এলাকার উলুল-আমর বা দায়িত্বশীলদের নিকট খবরটি আস্থাভাজন হওয়ার পর তারা তা গ্রহণ করে ঘোষণা দিতে হবে।
যদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা না দেওয়ার কারণে কোনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ চাঁদের খবর গ্রহণ না করে, তাহলে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে ওই খবর গ্রহণ করে তদানুযায়ী মানুষকে আমলের দাওয়াত দিয়ে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা জায়েয নয়। এটি উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, এতে কারো দ্বিমত নেই। (তাবঈনুল হাকায়েক : ১/৩২১)
সারা বিশ্বে একসঙ্গে রোজা-ঈদ পালনে অসুবিধা
পশ্চিমের দেশগুলোর চাঁদের দর্শন অনুসারে অন্যান্য দেশে আমল করা সম্ভব হয় না বিভিন্ন জটিলতার কারণে, যথা :
১. আরবের চাঁদ অনুসারে বিশ্বের সবাই রোজা শুরু করতে গেলে সন্ধ্যায় যখন আরবে চাঁদ দেখা যায়, তখন পূর্বের অনেক দেশের মানুষ গভীর রাতে ঘুমে থাকে, এমনকি একেবারে পূর্বের কিছু দেশে যথা—মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদিতে রাতের শেষ প্রহরের সামান্য কিছু সময় বাকি থাকে, এ অবস্থায় তারা তারাবি পড়বে কখন এবং সাহরি খাবে কখন? এরূপ আরো বিবিধ জটিলতা তৈরি হয়। অবশ্য এ জটিলতাটি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম অনুভূত হয়।
২. চাঁদের খবরের সূত্রের অনির্ভরযোগ্যতাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী থাকে। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের নিকট ওই খবর বিভিন্ন কারণে আস্থা অর্জন করতে পারে না।
৩. খেলাফতব্যবস্থা না থাকার কারণে কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের বিচ্ছিন্নতা এবং সমগ্র পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালকদের পরস্পর এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সমন্বয়হীনতাও এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী।
মূল কথা হলো, সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনে শরিয়ত বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি, বরং নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পৌঁছার মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের নিকট আস্থাভাজন হলে এবং তা পালন সহজ হলে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে বিধান আরোপিত হবে। আর যদি নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর না পৌঁছে, কিংবা দায়িত্বশীলদের নিকট আস্থাভাজন না হয়, তাহলে অন্য দেশে চাঁদ উঠলেও সারা বিশ্বের সবাই একসঙ্গে পালন করার কোনো আবশ্যিকতা শরিয়তে নেই।
সৌদি আরবের অনুসরণ আবশ্যক হওয়ার দাবি ভিত্তিহীন
আমাদের দেশে কিছু ভাই এমন দাবি করছে, যা কোরআন-সুন্নাহ ও ফোকাহায়ে কেরামের মতের সঙ্গে মেলে না। তাদের দাবি হলো—পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চল থেকে চাঁদের সংবাদ যেকোনো মাধ্যমেই প্রচারিত হলে সারা বিশ্বে তদানুযায়ী আমল করা আবশ্যক। এমনকি সৌদির চাঁদের খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হলেই নিজ নিজ দেশে নির্ভরযোগ্য হেলাল-কমিটি থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সৌদির খবরের ওপর আমল করতে হবে—এ হলো তাদের দাবি। এ ক্ষেত্রে তারা ফোকাহায়ে কেরামের প্রদত্ত সর্বসম্মত শর্তগুলোরও কোনো তোয়াক্কা করে না। অথচ সর্বদা সৌদি আরবেই সর্বপ্রথম চাঁদ দেখা যায় এমন নয়, বরং সৌদি আরবের আগেও কখনো কখনো অন্য দেশে চাঁদ দেখা যেতে পারে, যেমন ১৪৪৩ হিজরির (২০২২ ঈ.) ঈদুল ফিতরের চাঁদ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আফগানিস্তান, নাইজার ও মালিবাসী দেখেছে। এর পরদিন সৌদিসহ অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্টে দেখা গেছে। তাহলে তো এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সঙ্গে ঈদ করলেও তাদের দাবি অনুসারেই সর্বপ্রথম চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল হলো না।
আগের যুগে কি প্রচার ও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না?
অনেকে বলে যে আগের যুগে তো যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাধ্য হয়ে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার চাঁদের ভিত্তিতে আমল করতেন। আর এখন তো বিশ্বায়নের যুগে হাতের মুঠোয় সারা বিশ্ব, তাই এখন আর আগের বিধান প্রযোজ্য হবে না।
এ কথা ভুল, কেননা প্রচারব্যবস্থা ইসলামের শুরুর যুগ থেকে সব যুগেই কমবেশি ছিল। প্রত্যেক যুগেই তার পূর্ববর্তী যুগ থেকে উন্নত থেকে উন্নততর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। খলিফা আবু বকর (রা.)-এর যুগেও ডাকের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা উন্নতি করেছে। আরবে ‘ঘোড়ার ডাক’ অনেক প্রাচীন। ডাকপিয়নের রাত-দিন লাগাতার দ্রুতগতিতে সফর করতে হতো। কয়েক মাইল পর পর তাজাদম ঘোড়া প্রস্তুত থাকত। আরবে ডাকব্যবস্থা প্রাচীনকালে কত উন্নত ছিল সে বিষয়ের আলোচনা ইতিহাসে রয়েছে। আগের যুগে প্রচলিত ‘আকাশ-ডাকে’র এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকার ‘পায়রার ডাক’সহ বিভিন্ন প্রকারের ডাকব্যবস্থা ছিল।ঐতিহাসিক মাকরিজি (রহ.) (মৃত্যু : ৮৪৫হি.)
লেখেন : ২৬১ হিজরিতে আফ্রিকায় যে সময় ইবরাহিম বিন মুহাম্মদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন তিনি সমুদ্রতীরে ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাইল পর পর দুর্গ ও চৌকি স্থাপন করেন। তখন দুর্গে আগুন প্রজ্বলিত করার মাধ্যমে সাবতা থেকে ইস্কান্দারিয়া পর্যন্ত এক রাতেই সংবাদ পৌঁছে যেত। অথচ সাবতা আর ইস্কান্দারিয়ার মধ্যে চার হাজার ২৭৯ কিলোমিটারের দূরত্ব।(আলমাওয়ায়েজ ওয়াল ইতিবার : ১/৩২২)
এমনিভাবে ইস্কান্দারিয়া থেকে তারাবলুসে রাতে কয়েক ঘণ্টায় খবর পৌঁছে যেত। উভয় শহরের মধ্যে দূরত্ব মোট ১৮৮২ কিলোমিটার। (আলমুজিব ফি তালখিসি আখবারিল মাগারিব, পৃষ্ঠা-২৫০)
একই দিনে ঈদ করার ওপর কি মুসলিম ঐক্য নির্ভরশীল?
কোনো কোনো ভাই বলতে চান যে সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা শুরু ও ঈদ করার ওপর মুসলিমদের ঐক্য নির্ভরশীল, তাই তা আবশ্যক। এটি একটি অবাস্তব কথা, কেননা বর্তমানে আমরা দেখছি যে এই ঐক্যের নামে তারাই বরং নিজ দেশের মুসলিম জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐক্যের জন্য এটিই কল্যাণকর যে প্রত্যেক দেশের মুসলিমরা নিজ নিজ দেশের নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে আমল করবে।
অতএব, সব মুসলিমের দায়িত্ব হলো, বিশৃঙ্খলার পথে না গিয়ে নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীলদের অনুসরণে স্বদেশি মুসলিমদের সঙ্গে ঐক্য বজায় রেখে আমল চালিয়ে যাওয়া। তবে যদি দায়িত্বশীলরা ভুল করেন, তাহলে মুফতিয়ানে কেরাম দায়িত্বশীলদের সতর্ক করবেন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন।
অনলাইন ডেস্ক, 

























