কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘গত দুই মাসে নগদ টাকা উত্তোলনের পরিমাণ বেড়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এটি ঘটছে। কারণ নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে প্রার্থীরা টাকা উত্তোলন করছেন। দেশের মোট প্রচলিত মুদ্রা থেকে ব্যাংকে জমা টাকা বাদ দিয়ে প্রতি মাসে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
এতে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। গত বছরের জুলাই থেকে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা কমতে শুরু করে। এই ধারাবাহিকতা নভেম্বর পর্যন্ত বজায় ছিল। তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, আগস্টে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা এবং অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা।
অবশ্য এই সময়ে নির্বাচনে কালোটাকার দৌরাত্ম্য কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নির্বাচন কমিশন কয়েকটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
গত ১১ জানুয়ারি থেকে নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলনে তদারকি জোরদার করেছে বিএফআইইউ। সংস্থাটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো একটি হিসাবে কোনো নির্দিষ্ট দিনে এক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তদূর্ধ্ব অর্থ কিংবা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা জমা বা উত্তোলনের (অনলাইন, এটিএমসহ যেকোনো ধরনের নগদ লেনদেন) ক্ষেত্রে বিএফআইইউর কাছে নগদ লেনদেনের প্রতিবেদন (সিটিআর) অবশ্যই জমা দিতে হবে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই নগদ লেনদেন প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহের রিপোর্ট পরবর্তী সপ্তাহের তিন কার্যদিবসের মধ্যে জমা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে সিটিআর দাখিলে ব্যর্থতা কিংবা ভুল, অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা তথ্য বা বিবরণী সরবরাহ করলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা (এমএফএস) সীমিত করা হচ্ছে। এর ফলে বিকাশ, রকেট, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার গ্রাহকরা দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন। প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা হবে ১ হাজার টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির হিসাবে টাকা স্থানান্তর সেবা বন্ধ রাখা হবে। ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সীমিতকরণ অব্যাহত থাকবে।
জানা গেছে, নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে যাতে অর্থের অপব্যবহার না করা যায়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ অবাধে কালোটাকার ব্যবহার কমাতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হবে না। যারা রাজনীতিকে একধরনের বাণিজ্য মনে করেন, তারা যেকোনো প্রকারে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য কালোটাকা ছড়াবেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নিজেদের আখের গোছানোর জন্য। এমপি হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাতারাতি ফুলে ফেঁপে ওঠার জন্যই তারা রাজনীতিকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা জনগণের সেবক নন। জনসেবা তাদের রাজনীতি করার উদ্দেশ্য নয়।
এদের কারণেই রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে। রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। এরা রাজনীতি করে শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার জন্য। রাজনীতি করে এরা জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য বিনিয়োগ করেন। কালোটাকা দিয়ে এরা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। নির্বাচনে জিতে শুরু করে লুটপাট। লাভসহ খরচের টাকা তুলে নিয়ে যায়। রাজনীতির এই দুষ্টচক্র বন্ধ না করতে পারলে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে না, গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। এজন্যই নির্বাচনে কালোটাকার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে ভোটারদের। নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে আরও কঠোর।


























