ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সকালের ক্লান্তি দূর করতে যে পরামর্শ দিলেন গ্যাস্ট্রোএন্টারলজিস্ট

  • প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 29

সকালের ক্লান্তি দূর করতে যে পরামর্শ দিলেন গ্যাস্ট্রোএন্টারলজিস্ট

সকালে ঘুম থেকে উঠেই শরীর যেন ভেঙে পড়ে, ক্লান্তি যেন কাটতে চায় না, আবার দুপুরের আগে চোখ ভারী হয়ে আসে। দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগ অনেকেরই। দিনের শুরুতেই যখন এনার্জি লেভেল নিচে নেমে যায়, তখন কাজের প্রতি মনোযোগ এবং সক্রিয়তা দুটোই মারাত্মকভাবে কমে যায়।

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. পাল মনিক্কম জানিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে এমন ক্লান্তি নিয়ে জেগে ওঠার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস, ভুল সময়ে খাওয়া বা রাতে অতিরিক্ত আলো-শব্দের পরিবেশে থাকা।

তার মতে, কিছু ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করলেই ঘুমের গুণগত মান বাড়ে এবং সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে শরীরে ফিরে আসে স্বাভাবিক সক্রিয়তা।

ডা. মনিক্কম জানান, ঘুম ঠিক রাখতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, ফিক্সড স্লিপ সাইকেল। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদমকে স্থিতিশীল রাখে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমানোর আগে অন্তত একঘণ্টা ফোন, টিভি বা স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উচিত।

নীল আলো মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম গভীর হয় না। ঘুমানোর ২০–৩০ মিনিট আগে নরম আলো, বই পড়া বা গরম পানিতে গোসল—এই ধরনের রিল্যাক্সিং রুটিন শরীরকে ঘুমের জন্য তৈরি রাখে।

ঘুম ভালো হওয়ার আরেকটি প্রধান উপাদান হলো আলো নিয়ন্ত্রণ। চড়া আলো শরীরকে ভুল সংকেত দেয় যে দিন এখনো শেষ হয়নি।

তাই ঘর অন্ধকার রাখার জন্য ব্ল্যাকআউট কারটেইনস অত্যন্ত কাজের।

এগুলো বাইরের গাড়ির আলো, স্ট্রিটলাইট বা ভোরের সূর্যালোক ঘরে ঢুকতে দেয় না। অন্ধকার পরিবেশ মেলাটোনিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং ঘুম আরো গভীর ও টানা হয়। ফলে সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে মাথা ভারী লাগে না, শরীরও সতেজ থাকে।

অনেকের ঘুম নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ হলো ঘরের তাপমাত্রা ঠিক না রাখা।

ঘুমের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই একটু ঠাণ্ডা হয়, ফলে ঘরের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম হলে ঘুম দ্রুত আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮ থেকে ১৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঘুমের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা। বেশি গরম ঘুমের ছন্দ ভেঙে দেয় এবং ঘুমের মাঝখানে বার বার জাগিয়ে দেয়। ফলে সকালে ক্লান্তি আরো বেড়ে যায়।

ঘুমের পরিবেশ মনকে কিভাবে সংকেত দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিছানা শুধু ঘুমের জায়গা—এই মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিং খুবই কাজের। যদি বিছানায় বসে বার বার ফোন দেখা, সিরিজ দেখা বা খাওয়া-দাওয়া করার অভ্যাস থাকে, তাহলেও মস্তিষ্ক বিছানাকে বিশ্রামের জায়গা ভাবতে ভুলে যায়। ফলে শুতে গেলেও ঘুম আসে না। তাই বিছানা শুধু ঘুম ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করাই শ্রেয়।

রাতে দেরিতে খাওয়া অনেকেরই একটি বড় সমস্যা। খাবার ঠিকমতো হজম হওয়ার আগেই শুতে গেলে এসিডিটি, অম্বল বা গ্যাসের সমস্যা তৈরি হয়। এতে ঘুম ভেঙে যেতে পারে বা ঘুম গভীর হয় না। আগে রাতের খাবার খেলে শরীর হজমের কাজ শেষ করে ঘুমে প্রবেশ করে। ফলে সকালে শরীর খুব হালকা লাগে। পেট গরম বা ভারী হয়ে থাকার কারণে সকালের ক্লান্তিও কমে।

অনেকেই ভাবেন বিকেলের পরেও কফি বা চা খেলেই ঘুম আসবে—এটাও ভুল ধারণা। ক্যাফেইন শরীরে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। তাই দুপুর ৩টার পর ক্যাফেইন নেওয়া ঘুমকে সরাসরি নষ্ট করতে পারে। ঘুমাতে সমস্যা হলে পরদিন সকালেও অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগবে। তাই সন্ধ্যার পর কফি, ব্ল্যাক টি, চকোলেট বা এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলাই ভালো।

দিনের শেষে মাত্র ১০ মিনিট নীরবতায় বসা, মেডিটেশন করা বা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়া শরীর-মনকে শান্ত করে। স্ট্রেস কমলে ঘুম স্বাভাবিকভাবেই ভালো হয় এবং সকালে উঠে মাথা পরিষ্কার লাগে। ঘুমের মান শুধু শারীরিক নয়, মানসিক বিশ্রামের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে শান্ত রাখাটা অত্যন্ত জরুরি।

এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত পালন করলে শুধু সকালের ক্লান্তি দূর হয় না, শরীরের এনার্জি লেভেলও সারা দিন ধরে বাড়তি থাকে। ঘুমের মান ভালো হলে মনোযোগ, স্মরণশক্তি, হরমোন ব্যালান্স—সবই উন্নত হয়। তবে কোনো নতুন রুটিন শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যপরিস্থিতি অনুযায়ী ডাক্তারি পরামর্শ নেওয়ার কথা বলছেন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সকালের ক্লান্তি দূর করতে যে পরামর্শ দিলেন গ্যাস্ট্রোএন্টারলজিস্ট

আপডেট সময় : ১০:৪৭:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
সকালে ঘুম থেকে উঠেই শরীর যেন ভেঙে পড়ে, ক্লান্তি যেন কাটতে চায় না, আবার দুপুরের আগে চোখ ভারী হয়ে আসে। দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগ অনেকেরই। দিনের শুরুতেই যখন এনার্জি লেভেল নিচে নেমে যায়, তখন কাজের প্রতি মনোযোগ এবং সক্রিয়তা দুটোই মারাত্মকভাবে কমে যায়।

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. পাল মনিক্কম জানিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে এমন ক্লান্তি নিয়ে জেগে ওঠার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস, ভুল সময়ে খাওয়া বা রাতে অতিরিক্ত আলো-শব্দের পরিবেশে থাকা।

তার মতে, কিছু ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করলেই ঘুমের গুণগত মান বাড়ে এবং সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে শরীরে ফিরে আসে স্বাভাবিক সক্রিয়তা।

ডা. মনিক্কম জানান, ঘুম ঠিক রাখতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, ফিক্সড স্লিপ সাইকেল। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদমকে স্থিতিশীল রাখে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমানোর আগে অন্তত একঘণ্টা ফোন, টিভি বা স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উচিত।

নীল আলো মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম গভীর হয় না। ঘুমানোর ২০–৩০ মিনিট আগে নরম আলো, বই পড়া বা গরম পানিতে গোসল—এই ধরনের রিল্যাক্সিং রুটিন শরীরকে ঘুমের জন্য তৈরি রাখে।

ঘুম ভালো হওয়ার আরেকটি প্রধান উপাদান হলো আলো নিয়ন্ত্রণ। চড়া আলো শরীরকে ভুল সংকেত দেয় যে দিন এখনো শেষ হয়নি।

তাই ঘর অন্ধকার রাখার জন্য ব্ল্যাকআউট কারটেইনস অত্যন্ত কাজের।

এগুলো বাইরের গাড়ির আলো, স্ট্রিটলাইট বা ভোরের সূর্যালোক ঘরে ঢুকতে দেয় না। অন্ধকার পরিবেশ মেলাটোনিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং ঘুম আরো গভীর ও টানা হয়। ফলে সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে মাথা ভারী লাগে না, শরীরও সতেজ থাকে।

অনেকের ঘুম নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ হলো ঘরের তাপমাত্রা ঠিক না রাখা।

ঘুমের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই একটু ঠাণ্ডা হয়, ফলে ঘরের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম হলে ঘুম দ্রুত আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮ থেকে ১৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঘুমের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা। বেশি গরম ঘুমের ছন্দ ভেঙে দেয় এবং ঘুমের মাঝখানে বার বার জাগিয়ে দেয়। ফলে সকালে ক্লান্তি আরো বেড়ে যায়।

ঘুমের পরিবেশ মনকে কিভাবে সংকেত দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিছানা শুধু ঘুমের জায়গা—এই মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিং খুবই কাজের। যদি বিছানায় বসে বার বার ফোন দেখা, সিরিজ দেখা বা খাওয়া-দাওয়া করার অভ্যাস থাকে, তাহলেও মস্তিষ্ক বিছানাকে বিশ্রামের জায়গা ভাবতে ভুলে যায়। ফলে শুতে গেলেও ঘুম আসে না। তাই বিছানা শুধু ঘুম ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করাই শ্রেয়।

রাতে দেরিতে খাওয়া অনেকেরই একটি বড় সমস্যা। খাবার ঠিকমতো হজম হওয়ার আগেই শুতে গেলে এসিডিটি, অম্বল বা গ্যাসের সমস্যা তৈরি হয়। এতে ঘুম ভেঙে যেতে পারে বা ঘুম গভীর হয় না। আগে রাতের খাবার খেলে শরীর হজমের কাজ শেষ করে ঘুমে প্রবেশ করে। ফলে সকালে শরীর খুব হালকা লাগে। পেট গরম বা ভারী হয়ে থাকার কারণে সকালের ক্লান্তিও কমে।

অনেকেই ভাবেন বিকেলের পরেও কফি বা চা খেলেই ঘুম আসবে—এটাও ভুল ধারণা। ক্যাফেইন শরীরে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। তাই দুপুর ৩টার পর ক্যাফেইন নেওয়া ঘুমকে সরাসরি নষ্ট করতে পারে। ঘুমাতে সমস্যা হলে পরদিন সকালেও অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগবে। তাই সন্ধ্যার পর কফি, ব্ল্যাক টি, চকোলেট বা এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলাই ভালো।

দিনের শেষে মাত্র ১০ মিনিট নীরবতায় বসা, মেডিটেশন করা বা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়া শরীর-মনকে শান্ত করে। স্ট্রেস কমলে ঘুম স্বাভাবিকভাবেই ভালো হয় এবং সকালে উঠে মাথা পরিষ্কার লাগে। ঘুমের মান শুধু শারীরিক নয়, মানসিক বিশ্রামের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে শান্ত রাখাটা অত্যন্ত জরুরি।

এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত পালন করলে শুধু সকালের ক্লান্তি দূর হয় না, শরীরের এনার্জি লেভেলও সারা দিন ধরে বাড়তি থাকে। ঘুমের মান ভালো হলে মনোযোগ, স্মরণশক্তি, হরমোন ব্যালান্স—সবই উন্নত হয়। তবে কোনো নতুন রুটিন শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যপরিস্থিতি অনুযায়ী ডাক্তারি পরামর্শ নেওয়ার কথা বলছেন।