ঢাকা ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশুরা

মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশুরা

মূল ফটকের পকেট দরজা খোলা। কিছুক্ষণ পর পর সেখান দিয়ে একজন-দুজন করে নারী ও শিশু আসছেন। কেউ আসছেন চিকিৎসকের খোঁজে, কেউ ওষুধ নিতে। কেউ আসছেন সন্তান প্রসবের আগে জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশায়।

কিন্তু হাসপাতাল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আগতরা দেখছেন মূল ফটকসহ সব কক্ষই তালাবদ্ধ; নার্স, চিকিৎসক, ওষুধ— কোনোটিই নেই। সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা।
মাদরীপুরের শিবচর উপজেলায় অবস্থিত তিনটি ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। ভাণ্ডারীকান্দি ইউনিয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন এবং বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নে হাজী আবুল কাশেম উকিল মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গতকাল রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করে প্রতিবেদক এ চিত্র দেখতে পান।

অথচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়েছে গর্ভবতী মায়েদের সিজারিয়ান (অস্ত্রোপচার) ও শিশুদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য, যা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকার কথা। কিন্তু মেডিক্যাল সরঞ্জাম, ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে জানান জেলা পরিবার পরিকল্পনা।স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর মাদারীপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে পাঁচ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নে হাজী আবুল কাশেম উকিল এবং একই বছরে চার কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দত্তপাড়ায় চৌধুরী ফাতেমা বেগম ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২০২২ সালে পাঁচ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে, শিরুয়াইল ইউনিয়নে ছয় কোটি ৩২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি হাসপাতাল নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে, যার অগ্রগতি বর্তমানে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। হাসপাতাল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টারও নির্মাণ করা হয়।উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এখানে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পদ রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে দুইজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক একজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর পর থেকে অধিকাংশ পদই শূন্য।

বর্তমানে কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত দায়িত্বে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন সীমিত সেবা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।চর গ্রাম থেকে সেবা নিতে আসা লাইলি বেগম বলেন, ডাক্তার দেখাইতে হাসপাতালে আইছিলাম। কিন্তু দেখি সব রুমে তালা মারা। তাই বাড়িতে চইলা যাইতেছি। মাঝেমধ্যে হাসপাতালে আইসা খোলা পাই, আবার মাঝেমধ্যে বন্ধও পাই। ওষুধের অবস্থাও একই। তবু বারবার আসি, কারণ এ জায়গায় বিনা টাকায় ডাক্তার দেহানো যায়, আর টুকটাক ওষুধ পাওয়া যায়। এতে আমাদের মতো গরিব মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হয়।

চর কামারকান্দি এলাকার নূরজাহান বেগম বলেন, জরুরি প্রয়োজনে অনেক কষ্ট করে এই হাসপাতালে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি কোনো চিকিৎসক নেই, হাসপাতাল তালা দিয়ে বন্ধ করা। এত দূর থেকে এসে এভাবে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে, এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, অবকাঠামো আছে, কিন্তু চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটে পড়ে আছে পুরো হাসপাতাল।

ওয়াহীদুজ্জামান নামের এক সমাজসেবক বলেন, মা ও শিশুদের জন্য সরকার হাসপাতালে করেছে। কিন্তু এখানে ডাক্তার থাকেন না, ওষুধ থাকে না। অনেক সময় হাসপাতালের গেট বন্ধ থাকে। জনগণের করের কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হলেও জনগণের তেমন কোনো উপকারে আসছে না। তিনি বলেন,  সেবা পাওয়া না গেলে এত টাকা দিয়ে ভবন বানিয়ে লাভ কী? আমাদের দাবি, যে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মাদারীপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা উপপরিচালক মতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকট থাকায় সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন নিয়োগের সার্কুলার হয়নি। নতুন সরকার আসলে সার্কুলার দিয়ে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিলে দ্রুত এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, জনবল না থাকায় ২৪ ঘণ্টা বা প্রতিদিন সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সীমিত জনবল দিয়ে মানুষকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। অতিরিক্ত দায়িত্বে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন সেবা চালু রাখা হচ্ছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশুরা

আপডেট সময় : ০৮:৪৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
মূল ফটকের পকেট দরজা খোলা। কিছুক্ষণ পর পর সেখান দিয়ে একজন-দুজন করে নারী ও শিশু আসছেন। কেউ আসছেন চিকিৎসকের খোঁজে, কেউ ওষুধ নিতে। কেউ আসছেন সন্তান প্রসবের আগে জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশায়।

কিন্তু হাসপাতাল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আগতরা দেখছেন মূল ফটকসহ সব কক্ষই তালাবদ্ধ; নার্স, চিকিৎসক, ওষুধ— কোনোটিই নেই। সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা।
মাদরীপুরের শিবচর উপজেলায় অবস্থিত তিনটি ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। ভাণ্ডারীকান্দি ইউনিয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন এবং বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নে হাজী আবুল কাশেম উকিল মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গতকাল রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করে প্রতিবেদক এ চিত্র দেখতে পান।

অথচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়েছে গর্ভবতী মায়েদের সিজারিয়ান (অস্ত্রোপচার) ও শিশুদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য, যা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকার কথা। কিন্তু মেডিক্যাল সরঞ্জাম, ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে জানান জেলা পরিবার পরিকল্পনা।স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর মাদারীপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে পাঁচ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নে হাজী আবুল কাশেম উকিল এবং একই বছরে চার কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দত্তপাড়ায় চৌধুরী ফাতেমা বেগম ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২০২২ সালে পাঁচ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে, শিরুয়াইল ইউনিয়নে ছয় কোটি ৩২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি হাসপাতাল নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে, যার অগ্রগতি বর্তমানে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। হাসপাতাল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টারও নির্মাণ করা হয়।উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এখানে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পদ রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে দুইজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক একজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর পর থেকে অধিকাংশ পদই শূন্য।

বর্তমানে কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত দায়িত্বে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন সীমিত সেবা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।চর গ্রাম থেকে সেবা নিতে আসা লাইলি বেগম বলেন, ডাক্তার দেখাইতে হাসপাতালে আইছিলাম। কিন্তু দেখি সব রুমে তালা মারা। তাই বাড়িতে চইলা যাইতেছি। মাঝেমধ্যে হাসপাতালে আইসা খোলা পাই, আবার মাঝেমধ্যে বন্ধও পাই। ওষুধের অবস্থাও একই। তবু বারবার আসি, কারণ এ জায়গায় বিনা টাকায় ডাক্তার দেহানো যায়, আর টুকটাক ওষুধ পাওয়া যায়। এতে আমাদের মতো গরিব মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হয়।

চর কামারকান্দি এলাকার নূরজাহান বেগম বলেন, জরুরি প্রয়োজনে অনেক কষ্ট করে এই হাসপাতালে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি কোনো চিকিৎসক নেই, হাসপাতাল তালা দিয়ে বন্ধ করা। এত দূর থেকে এসে এভাবে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে, এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, অবকাঠামো আছে, কিন্তু চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটে পড়ে আছে পুরো হাসপাতাল।

ওয়াহীদুজ্জামান নামের এক সমাজসেবক বলেন, মা ও শিশুদের জন্য সরকার হাসপাতালে করেছে। কিন্তু এখানে ডাক্তার থাকেন না, ওষুধ থাকে না। অনেক সময় হাসপাতালের গেট বন্ধ থাকে। জনগণের করের কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হলেও জনগণের তেমন কোনো উপকারে আসছে না। তিনি বলেন,  সেবা পাওয়া না গেলে এত টাকা দিয়ে ভবন বানিয়ে লাভ কী? আমাদের দাবি, যে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মাদারীপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা উপপরিচালক মতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকট থাকায় সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন নিয়োগের সার্কুলার হয়নি। নতুন সরকার আসলে সার্কুলার দিয়ে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিলে দ্রুত এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, জনবল না থাকায় ২৪ ঘণ্টা বা প্রতিদিন সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সীমিত জনবল দিয়ে মানুষকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। অতিরিক্ত দায়িত্বে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা দিয়ে প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন সেবা চালু রাখা হচ্ছে।