বর্তমান যুগে স্মার্টফোনের এক ক্লিকেই মুহূর্তের মধ্যে ছবি তোলা যায়। সেলফি হোক বা পেশাদার আলোকচিত্র—সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই আধুনিক সুবিধার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং অসংখ্য পরীক্ষানিরীক্ষার ইতিহাস। অনেকেই জানেন না, বিশ্বের প্রথম ছবিটি তুলতে ক্যামেরার সামনে টানা অন্তত ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
১৮২৬ বা ১৮২৭ সালের দিকে ইতিহাসের প্রথম সফল আলোকচিত্রটি তুলেছিলেন ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর নিপস। ফ্রান্সের বার্গান্ডি অঞ্চলে অবস্থিত তার নিজ বাড়ির দোতলার জানলা থেকে বাইরের দৃশ্য ধারণ করেন তিনি। ছবিটির নাম দেওয়া হয় ‘View from the Window at Le Gras’। এটিকেই আজ বিশ্বের প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সেই সময়ে আধুনিক ক্যামেরা, ফিল্ম কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির অস্তিত্ব ছিল না। তখন আলোকচিত্র ধারণ ছিল পুরোপুরি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। নিপস যে পদ্ধতিতে ছবিটি তুলেছিলেন, সেটির নাম ছিল ‘হেলিওগ্রাফি’, যার অর্থ ‘সূর্য লিখন’। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি পালিশ করা পিউটার প্লেটের ওপর ‘বিটুমিন অফ জুডিয়া’ নামের পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের প্রলেপ ব্যবহার করেন।
প্রলেপ দেওয়া প্লেটটি তিনি একটি ক্যামেরা অবসকিউরা বাক্সের ভেতরে স্থাপন করেন এবং সেটি জানলার দিকে তাক করে রাখেন। তবে ওই সময় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলোর আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা ছিল খুবই কম। ফলে ছবিটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে প্লেটটির ওপর দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো পড়া প্রয়োজন হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই এক্সপোজার প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। কেউ কেউ ধারণা করেন, এটি কয়েক দিনও স্থায়ী হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে ছবি তোলার কারণে ছবিটিতে একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ছবির ভবন ও ছাদের দুই পাশেই সূর্যের আলো প্রায় সমানভাবে পড়েছে। কারণ, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সূর্য পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে সরে যায়। এর ফলেই আলো ছবির উভয় পাশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
ছবি তোলার পর নিপস রাসায়নিক দ্রবণ দিয়ে প্লেটটি ধুয়ে নেন। যেখানে সূর্যের আলো পড়েছিল, সেখানে প্রলেপ শক্ত হয়ে যায়। আর যেসব অংশে আলো পড়েনি, সেগুলো ধুয়ে যায়। এভাবেই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় ইতিহাসের প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ছবিটি সংরক্ষিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যারি র্যানসাম সেন্টারে। ছবিটিকে অক্সিজেনবিহীন বিশেষ একটি কেসে রাখা হয়েছে, যাতে এটি দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে। আলোকচিত্রের ইতিহাসে এটি একটি অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপসের এই আবিষ্কারই আধুনিক ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফির ভিত্তি গড়ে দেয়। একসময় ছবি তুলতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে আজ মিলিসেকেন্ডেই ছবি তোলা সম্ভব। তবুও ইতিহাসের সেই প্রথম ছবিটি আজও মনে করিয়ে দেয় মানুষের উদ্ভা






















