ঢাকা ০৫:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সার্ভিস লেন দখল করে রমরমা বানিজ্য

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সার্ভিস লেন দখল করে রমরমা বানিজ্য

গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস লেন দখল করে প্রতিদিন বসছে বিশাল অবৈধ হাটবাজার। বিস্ময়কর হলেও সত্য ট্রাফিক পুলিশ অফিস থেকে মাত্র ৫০-১০০ গজ দূরত্বে দিনের আলোয় শত শত দোকান নিয়ে এই হাট পরিচালিত হলেও কার্যত নির্বিকার অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এতে করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা নয়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা, খাড়া জোড়া কালিয়াকৈরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে—ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখল করে নিয়মিত বসছে অবৈধ হাটবাজার।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের সার্ভিস লেন ও ফুটপাত সম্পূর্ণভাবে দখল করে কাপড়, জুতা, খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অসংখ্য ভাসমান দোকান বসানো হয়েছে। আবার খাড়া জোড়া মহাসড়কের সার্ভিস লেন দখল করে কার ওয়াশ করে এতে পথচারীর জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। ফলে নারী-পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছেন। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই অবৈধ বাজারের কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। জরুরি সেবার যানবাহন, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ছে।

কলেজছাত্র রাকিব হাসান বলেন, “প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। পুলিশ বক্সের সামনে এমন অবস্থা—তবুও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয় না।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, “ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। গত মাসেই এখানে এক নারী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।”

পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার পথচারী হুমায়ুন জানান, “ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারায় মানুষ মূল সড়কে চলাচল করছে, ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দ্রুত দখলমুক্ত করা জরুরি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও কথিত ‘যুবনেতা’ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি এই অবৈধ হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০-৫০০ দোকান থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু সদস্যের কাছেও পৌঁছে, ফলে উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

অটোরিকশা চালক সুরুজ মিয়া বলেন, “সার্ভিস লেন দখলমুক্ত থাকলে আমাদের মহাসড়কে উঠতে হতো না। এতে দুর্ঘটনাও কমে যেত।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, কালিয়াকৈরের এই অংশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে, যার বড় একটি কারণ এই অবৈধ বাজার। গত এক বছরে এ এলাকায় একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। নাম প্রকাশ করলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম. ফখরুল হুসাইন বলেন, “মহাসড়ক দখল করে হাট বসানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি শওগাতুল আলম বলেন, “আগেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পুনরায় দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের প্রশ্ন—আইনের চোখের সামনে এভাবে দখলদারিত্ব চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সার্ভিস লেন দখল করে রমরমা বানিজ্য

আপডেট সময় : ১০:০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস লেন দখল করে প্রতিদিন বসছে বিশাল অবৈধ হাটবাজার। বিস্ময়কর হলেও সত্য ট্রাফিক পুলিশ অফিস থেকে মাত্র ৫০-১০০ গজ দূরত্বে দিনের আলোয় শত শত দোকান নিয়ে এই হাট পরিচালিত হলেও কার্যত নির্বিকার অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এতে করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা নয়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা, খাড়া জোড়া কালিয়াকৈরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে—ফুটপাত ও সার্ভিস লেন দখল করে নিয়মিত বসছে অবৈধ হাটবাজার।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের সার্ভিস লেন ও ফুটপাত সম্পূর্ণভাবে দখল করে কাপড়, জুতা, খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অসংখ্য ভাসমান দোকান বসানো হয়েছে। আবার খাড়া জোড়া মহাসড়কের সার্ভিস লেন দখল করে কার ওয়াশ করে এতে পথচারীর জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। ফলে নারী-পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছেন। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই অবৈধ বাজারের কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। জরুরি সেবার যানবাহন, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ছে।

কলেজছাত্র রাকিব হাসান বলেন, “প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। পুলিশ বক্সের সামনে এমন অবস্থা—তবুও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয় না।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, “ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। গত মাসেই এখানে এক নারী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।”

পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার পথচারী হুমায়ুন জানান, “ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারায় মানুষ মূল সড়কে চলাচল করছে, ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দ্রুত দখলমুক্ত করা জরুরি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও কথিত ‘যুবনেতা’ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি এই অবৈধ হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০-৫০০ দোকান থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু সদস্যের কাছেও পৌঁছে, ফলে উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

অটোরিকশা চালক সুরুজ মিয়া বলেন, “সার্ভিস লেন দখলমুক্ত থাকলে আমাদের মহাসড়কে উঠতে হতো না। এতে দুর্ঘটনাও কমে যেত।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, কালিয়াকৈরের এই অংশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে, যার বড় একটি কারণ এই অবৈধ বাজার। গত এক বছরে এ এলাকায় একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। নাম প্রকাশ করলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম. ফখরুল হুসাইন বলেন, “মহাসড়ক দখল করে হাট বসানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি শওগাতুল আলম বলেন, “আগেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পুনরায় দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের প্রশ্ন—আইনের চোখের সামনে এভাবে দখলদারিত্ব চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?