ঢাকা ০৫:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চকচকে ভবন, নেই চিকিৎসাসেবা ৬ বছরেও চালু হয়নি রংপুর শিশু হাসপাতাল

চকচকে ভবন, নেই চিকিৎসাসেবা ৬ বছরেও চালু হয়নি রংপুর শিশু হাসপাতাল

রংপুরে প্রায় ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি ছয় বছর পেরিয়েও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় হাসপাতালটি এখনো কার্যত অচল। ফলে উত্তরাঞ্চলের লাখো শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে।

রংপুর নগরীর পুরাতন সদর হাসপাতাল এলাকায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই হাসপাতাল ভবনের কাজ শেষ হয় ২০২০ সালে। বহুতল ভবনটিতে শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য আইসিইউ, বিশেষ ওয়ার্ড, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ডরমেটরি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা রাখা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে হাসপাতালটি সাময়িকভাবে ‘করোনা ডেডিকেটেড স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সে সময় ১৫ শয্যার আইসিইউসহ প্রায় ৩০টি শয্যায় চিকিৎসাসেবা চালু ছিল। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও থমকে যায় হাসপাতালের কার্যক্রম। গত চার বছর ধরে ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝকঝকে আধুনিক ভবনের ভেতরে নেই রোগীর কোলাহল কিংবা চিকিৎসাসেবার কোনো কার্যক্রম। হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে পড়ে থাকা অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইসিইউ ইউনিটের মূল্যবান সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটি চালু করতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। এখনো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে না ওঠায় হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এখনই সব কার্যক্রম শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে হাসপাতালটি সচল করতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের চাহিদা জানতে চেয়েছে। এরই মধ্যে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন,
“সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি নির্ধারিত ফরমেটে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আমরা প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের চাহিদাসহ সব তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। দ্রুত হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছি।

অন্যদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর চাপ। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক সময় এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধাও নেই।

তিনি বলেন, বিশেষায়িত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপও অনেকাংশে কমে আসবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে থাকবে কেন? দ্রুত জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীরা।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

চকচকে ভবন, নেই চিকিৎসাসেবা ৬ বছরেও চালু হয়নি রংপুর শিশু হাসপাতাল

আপডেট সময় : ০১:৩২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

রংপুরে প্রায় ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি ছয় বছর পেরিয়েও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় হাসপাতালটি এখনো কার্যত অচল। ফলে উত্তরাঞ্চলের লাখো শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে।

রংপুর নগরীর পুরাতন সদর হাসপাতাল এলাকায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই হাসপাতাল ভবনের কাজ শেষ হয় ২০২০ সালে। বহুতল ভবনটিতে শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য আইসিইউ, বিশেষ ওয়ার্ড, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ডরমেটরি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা রাখা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে হাসপাতালটি সাময়িকভাবে ‘করোনা ডেডিকেটেড স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সে সময় ১৫ শয্যার আইসিইউসহ প্রায় ৩০টি শয্যায় চিকিৎসাসেবা চালু ছিল। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও থমকে যায় হাসপাতালের কার্যক্রম। গত চার বছর ধরে ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝকঝকে আধুনিক ভবনের ভেতরে নেই রোগীর কোলাহল কিংবা চিকিৎসাসেবার কোনো কার্যক্রম। হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে পড়ে থাকা অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইসিইউ ইউনিটের মূল্যবান সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটি চালু করতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। এখনো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে না ওঠায় হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এখনই সব কার্যক্রম শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে হাসপাতালটি সচল করতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের চাহিদা জানতে চেয়েছে। এরই মধ্যে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন,
“সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি নির্ধারিত ফরমেটে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আমরা প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের চাহিদাসহ সব তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। দ্রুত হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছি।

অন্যদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর চাপ। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক সময় এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধাও নেই।

তিনি বলেন, বিশেষায়িত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপও অনেকাংশে কমে আসবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে থাকবে কেন? দ্রুত জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীরা।