বগুড়া শহরতলির বনানী এলাকায় সন্ত্রাসী চক্রের ‘গুরু-শিষ্য’ দ্বন্দ্বের জেরে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে হাবিবুর রহমান রকি (২৮) নামে এক যুবককে। বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে বনানী কাস্টমস অফিসের সামনে মহাসড়কে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রকি বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই ও মারামারিসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে।
স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই এই হত্যার সূত্রপাত। চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন হারুন নামের এক ব্যক্তি, যিনি কাঠমিস্ত্রির পরিচয়ের আড়ালে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন রকি এবং যুবদল নেতা বাপ্পী।
প্রথমদিকে হারুনের নেতৃত্বে চক্রটি ফুটপাত দখল, দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায়, ইট-বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় একক আধিপত্য কায়েম করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে চক্রটির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে গত বছর রকি নিজ গ্রুপের সদস্য বাপ্পীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। পরে সুস্থ হয়ে বাপ্পী রকির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হারুনও তাঁর পক্ষ নেন। এতে রকি কার্যত একা হয়ে পড়েন এবং ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই অবস্থায় রকি তাঁর ‘গুরু’ হারুনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে হামলার চেষ্টা চালালে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হারুনের এক স্বজন আহত হন। এরপর হারুন কৌশল পাল্টে রকির সঙ্গে পুনরায় সখ্য গড়ে তোলেন, যা ছিল একটি পরিকল্পিত ফাঁদ।
ঘটনার দিন চাঁদাবাজির কথা বলে রকিকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। বনানীর একটি নির্জন গলিতে আগে থেকেই ওৎ পেতে ছিলেন হারুন, বাপ্পীসহ কয়েকজন সহযোগী। রকি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছালে প্রথমে পেছন থেকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তিনি সড়কে পড়ে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপ দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে অভিযান চালায়। র্যাব সদস্যরা শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত হারুনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী চক্রটির দৌরাত্ম্য চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে চক্রটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এখন সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিক ইকবাল জানান, নিহত রকির মা বাদী হয়ে হারুন, বাপ্পীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। প্রাথমিকভাবে চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগি এবং পূর্বের বিরোধকে এই হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনার নেপথ্যের আরও তথ্য উদঘাটনে প্রধান আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।






















