পুরোনো বছরের গ্লানি, দুঃখ-বঞ্চনা ধুঁয়ে-মুছে নতুন বছরের প্রত্যাশায় কুয়াকাটার শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন রাখাইন মহিলা মার্কেট মাঠে— তিনদিন ব্যাপী শুরু হয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের ‘রাখাইন মাহা সাংগ্রাই জলকেলি’ উৎসব। রাখাইন বর্ষবরণ ১৩৮৮ কে বরণে রাখাইন তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের নারী-পুরুষ এ অনুষ্ঠানে মেতে উঠেন। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়।
আজ বিকেল ৩টায় এক র্যালীর মাধ্যমে শুরু হয় এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এতে অংশ নেয় কুয়াকাটা ও পাশ্ববর্তী বিভিন্ন রাখাইন পল্লীর নারী-পুরুষসহ যুবকরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক।
এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহব্বত খান, ট্যুরিস্ট পুলিশ পরিদর্শক জয়ন্ত, কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির, পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি এমকে রানা, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক জসিম পারভেজ সহ স্থানীয় সংবাদকর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
উৎসবকে ঘিরে কুয়াকাটা রাখাইন পাড়ায় বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। সকাল থেকেই জলকেলিতে অংশ নিতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিড় জমায়। এমনকি পার্শ্ববর্তী বরগুনা জেলা থেকেও রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষজন অংশ নিতে আসেন এ উৎসবে।
উৎসবস্থলে সাজানো নৌকায় পানি রেখে একে অপরের গায়ে ছিটিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা। নাচ-গান আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কিশোর-কিশোরীরা দলবেঁধে জলকেলিতে মেতে উঠে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।
রাখাইন তরুণী মিয়াশু বলেন, সাংগ্রাই আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। আমরা বিশ্বাস করি, পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট এই পানির সঙ্গে মুছে যায়। নতুন বছরে আমরা নতুনভাবে শুরু করি।
রাখাইন মং বলেন, বাঙ্গালীর পহেলা বৈশাখ যেমন সবার, আমারা ‘সাংগ্রাই’ এই জলকেলির উৎসব তেমন সবার। যার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগাভাগি করি। এটি শুধু আনন্দের নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই আগামীর বাংলাদেশ হোক একটি সুখী, সুন্দর ও উন্নতির হোক।
দর্শনার্থী রাকিব হোসেন বলেন, এটা আমার জীবনে প্রথমবার এমন উৎসব দেখা। খুবই উপভোগ করছি। সবাই একসাথে আনন্দ করছে এটা সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।
বরগুনা থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী জান্নাতি আক্তার বলেন, রাখাইনদের এই উৎসব খুবই ব্যতিক্রম। পানি ছিটিয়ে আনন্দ করার এই আয়োজন আমাদের মুগ্ধ করেছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ কাউছার হামিদ বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের এই সাংগ্রাই উৎসব আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উৎসব সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে।
উৎসব চলবে আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। প্রতিদিনই থাকবে জলকেলির পাশাপাশি মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাখাইন পরিবারগুলোতে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন পিঠাপুলি, যা এ উৎসবের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই জলকেলি উৎসব শুধু রাখাইন সম্প্রদায়ের নয়, এখন এটি কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ###
আব্দুল কাইয়ুম (আরজু)
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি\
তাং- ১৬-০৪-২০২৬ ইং






















