ঢাকা ০৫:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়াকৈরে লাখ টাকার পাবলিক টয়লেট যেন জনদুর্ভোগের প্রতীক

কালিয়াকৈরে লাখ টাকার পাবলিক টয়লেট যেন জনদুর্ভোগের প্রতীক

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদ চত্বরে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত একমাত্র কমিউনিটি টয়লেটটি এখন জনদুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টয়লেটটি বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

২০২২ সালের এপ্রিলে পৌরসভা প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর টয়লেটটি নির্মাণ করে। তবে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে অবহেলা ও অযত্নে এটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সোমবার (৪ মে) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাচন অফিস, ভূমি অফিস, সমাজসেবা অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে সেবা নিতে আসা নারী-পুরুষদের জন্য থাকা একমাত্র পাবলিক টয়লেটটির ভেতরে মল-মূত্র, ইটের টুকরা, পলিথিন, শুকনো পাতা ও কাদা-পানির স্তূপ জমে আছে। নীল দেয়ালঘেরা টয়লেট ভবনের দরজা ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলা ও ময়লার দাগ। চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। ছাদের ওপর পানির ট্যাংক থাকলেও নেই পানির কোনো ব্যবস্থা।

টয়লেটটির নামফলকে উল্লেখ রয়েছে— “কমিউনিটি ল্যাট্রিন/টয়লেট (উপজেলা চত্বর)”। এটি ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ৩২ পৌরসভা প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, দুর্গন্ধে টয়লেটের আশপাশে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিদিন জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, নামজারি, ভাতার আবেদনসহ নানা কাজে উপজেলায় আসা মানুষদের জন্য এই একটিই পাবলিক টয়লেট।

ফুলবাড়িয়া থেকে আসা সেবাপ্রার্থী রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে এই টয়লেটে ঢোকাই যায় না। দুর্গন্ধে বমি আসে। বাধ্য হয়ে পাশের দোকানে যেতে হয়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা থাকলে আমাদের খুব উপকার হতো।”

মৌচাকের কলেজছাত্র সুমিন মিয়া বলেন, “নির্বাচন অফিসে কাজ করতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এই টয়লেটটাই ভরসা ছিল। কিন্তু এর অবস্থা গরু-ছাগলের গোয়ালের চেয়েও খারাপ। উপজেলা চত্বরে যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে বাইরের পরিস্থিতি সহজেই বোঝা যায়।” কালিয়াকৈর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালে টয়লেটটি নির্মাণ করে পৌরসভাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌরসভার। তবে লোকবল সংকট বা অন্য কোনো কারণে যথাযথ তদারকি হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হবে বলেও জানান তারা।

কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রকৌশলী হরিপদ রায় বলেন, “টয়লেটটি নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে—বিষয়টি জেনেছি। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সেবাপ্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।”

কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম. ফখরুল হুসাইন বলেন, “উপজেলা চত্বরে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য থাকা টয়লেটের এমন অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

পৌরনাগরিক ও এলাকাবাসীর দাবি, উপজেলা পরিষদ একটি উপজেলার প্রাণকেন্দ্র। সেখানে একটি পাবলিক টয়লেটের এমন বেহাল চিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা দ্রুত সংস্কার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কালিয়াকৈরে লাখ টাকার পাবলিক টয়লেট যেন জনদুর্ভোগের প্রতীক

আপডেট সময় : ০২:২৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদ চত্বরে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত একমাত্র কমিউনিটি টয়লেটটি এখন জনদুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টয়লেটটি বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

২০২২ সালের এপ্রিলে পৌরসভা প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর টয়লেটটি নির্মাণ করে। তবে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে অবহেলা ও অযত্নে এটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সোমবার (৪ মে) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাচন অফিস, ভূমি অফিস, সমাজসেবা অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে সেবা নিতে আসা নারী-পুরুষদের জন্য থাকা একমাত্র পাবলিক টয়লেটটির ভেতরে মল-মূত্র, ইটের টুকরা, পলিথিন, শুকনো পাতা ও কাদা-পানির স্তূপ জমে আছে। নীল দেয়ালঘেরা টয়লেট ভবনের দরজা ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলা ও ময়লার দাগ। চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। ছাদের ওপর পানির ট্যাংক থাকলেও নেই পানির কোনো ব্যবস্থা।

টয়লেটটির নামফলকে উল্লেখ রয়েছে— “কমিউনিটি ল্যাট্রিন/টয়লেট (উপজেলা চত্বর)”। এটি ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ৩২ পৌরসভা প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, দুর্গন্ধে টয়লেটের আশপাশে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিদিন জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, নামজারি, ভাতার আবেদনসহ নানা কাজে উপজেলায় আসা মানুষদের জন্য এই একটিই পাবলিক টয়লেট।

ফুলবাড়িয়া থেকে আসা সেবাপ্রার্থী রহিমা বেগম বলেন, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলে এই টয়লেটে ঢোকাই যায় না। দুর্গন্ধে বমি আসে। বাধ্য হয়ে পাশের দোকানে যেতে হয়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা থাকলে আমাদের খুব উপকার হতো।”

মৌচাকের কলেজছাত্র সুমিন মিয়া বলেন, “নির্বাচন অফিসে কাজ করতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এই টয়লেটটাই ভরসা ছিল। কিন্তু এর অবস্থা গরু-ছাগলের গোয়ালের চেয়েও খারাপ। উপজেলা চত্বরে যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে বাইরের পরিস্থিতি সহজেই বোঝা যায়।” কালিয়াকৈর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালে টয়লেটটি নির্মাণ করে পৌরসভাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌরসভার। তবে লোকবল সংকট বা অন্য কোনো কারণে যথাযথ তদারকি হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হবে বলেও জানান তারা।

কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রকৌশলী হরিপদ রায় বলেন, “টয়লেটটি নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে—বিষয়টি জেনেছি। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সেবাপ্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।”

কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম. ফখরুল হুসাইন বলেন, “উপজেলা চত্বরে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য থাকা টয়লেটের এমন অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

পৌরনাগরিক ও এলাকাবাসীর দাবি, উপজেলা পরিষদ একটি উপজেলার প্রাণকেন্দ্র। সেখানে একটি পাবলিক টয়লেটের এমন বেহাল চিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা দ্রুত সংস্কার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।