বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচনায় প্রায়শই ভ্রাতৃত্ব, গভীর বন্ধুত্ব এবং ঐতিহাসিক বন্ধনের মায়াজাল তৈরি করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতা হলো—যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তখনই অর্থবহ ও টেকসই হয়ে ওঠে, যখন তা পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা এবং দৃশ্যমান ন্যায্যতার শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মৌলিক উপাদানগুলোর অনুপস্থিতিতে কেবল ‘ভ্রাতৃত্বের’ সুদৃশ্য স্লোগান কূটনৈতিক সৌজন্যতার বাইরে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হতে বাধ্য।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্বঃ
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের সাথে চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থল সীমান্ত শেয়ার করে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে সহস্রাব্দের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিবিড় অর্থনৈতিক মেলবন্ধন। স্বাভাবিক নিয়মেই এই দুই রাষ্ট্র পরস্পরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নৈকট্য সত্ত্বেও, ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ‘বিগ ব্রাদার’ বা একাধিপত্যবাদী আচরণ উপমহাদেশের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনেও এক ধরনের দূরত্ব ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জনগণের সাথে টেকসই মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দলের প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে থাকার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা এদেশের সচেতন সমাজ ইতিবাচকভাবে নেয়নি। ফলশ্রুতিতে, ভারতের এই একপেশে বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নীতি শেষ পর্যন্ত খোদ দিল্লির জন্যও কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি বা কৌশলগত লাভ বয়ে আনতে পারেনি।
‘রাজনৈতিক দূত’ ও নতুন কূটনৈতিক সমীকরণঃ
৫৫ বছরের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম ভারত তার কোনো পেশাদার কূটনীতিকের (Career Diplomat) পরিবর্তে একজন ঝানু রাজনীতিবিদকে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে প্রেরণ করেছে। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং প্রবীণ সংসদ সদস্য দিনেশ ত্রিবেদীর এই নিযুক্তি প্রমাণ করে যে, ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার এখন ঢাকার সাথে সম্পর্ককে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক স্তরে ভিন্ন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
কিন্তু দিল্লির সাউথ ব্লককে এটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, বাংলাদেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো চতুর বা একপেশে কূটনীতি দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কখনও কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন সস্তা প্রচারণায় যখন ‘দুই দেশ এক করার’ মতো অবাস্তব রাজনৈতিক আওয়াজ তোলা হয়, তখন তা এদেশের মানুষের মনে নতুন করে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকির আশঙ্কা তৈরি করে। যদি সত্যিই একাত্মতা ও সৌহার্দের সদিচ্ছা থাকে, তবে রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক একীকরণের এই সস্তা আলাপের আগে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘অমিমাংসিত ক্ষত’ গুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
অভিন্ন নদীর জলবণ্টন: একতরফা নীতির অবসানঃ
দুই দেশের জনগণকে এক করার অবাস্তব প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—অভিন্ন নদীগুলোর ওপর থেকে আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূত ও একতরফা কৃত্রিম কৃচ্ছ্রসাধন তুলে নেওয়া। দুই দেশের মানুষকে এক করার আগে, ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে আটকে রাখা জলরাশিকে মুক্ত করে কৃত্রিম বাঁধের দুই পাশের জলকে প্রাকৃতিক নিয়মে একসাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উচিত।
তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করে ‘ভ্রাতৃত্বের ফাঁকা বুলি’ কেবলই এক ধরনের কূটনৈতিক পরিহাস ও সময়ের অপচয় মাত্র। বিশেষ করে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তার দীর্ঘমেয়াদি অমীমাংসিত সংকট নিরসনই হবে দিল্লির সদিচ্ছার প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা।
ইতিহাসের পুনর্পাঠ ও বিভাজনের রাজনীতিঃ
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই অঞ্চলকে এক করার চেয়ে বিভাজনের রাজনীতিতেই ভারতের তৎকালীন কিছু উগ্র ঘরানার নেতার ভূমিকা ছিল মুখ্য। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপটে শরৎ বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা’র প্রস্তাবকে নস্যাৎ করার পেছনে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির মতো নেতাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক অবস্থানই ছিল প্রধান কারণ।
সেদিন যদি তৎকালীন বাংলা ভাগ না হতো, তবে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা মিলে এই উপমহাদেশে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তির উত্থান ঘটত। সেই ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে আজকে যখন নতুন করে মৈত্রীর সস্তা বয়ান তৈরি করা হয়, তখন তা স্বভাবতই এদেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
একটি টেকসই ‘উইন-উইন’ কূটনীতির রূপরেখাঃ
ভারতকে বুঝতে হবে যে, সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং পরস্পরের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ (Win-Win Situation) বা পারস্পরিক লাভজনক ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা সম্ভব। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী যতই প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ হোন না কেন, বাংলাদেশে তাঁর আগমন ঘটেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি তথা কূটনীতিক হিসেবে, কোনো রাজনৈতিক প্রচারক হিসেবে নয়।
সুতরাং, অমূলক ও সস্তা রাজনৈতিক বয়ান পরিহার করে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও দৃশ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে মনোযোগী হওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে নিচের বিষয়গুলোতে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন:
১। সার্বভৌম সমতা: একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করা।
২। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানো: সীমান্তকে সম্পূর্ণ অহিংস রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্ত সুরক্ষার নীতি বজায় রাখা।
৩। বাণিজ্যিক ভারসাম্য: অশুল্ক ও আধা-শুল্ক বাধা দূর করে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।
৪। নদীর ন্যায্য হিস্যা: আন্তর্জাতিক নদী আইন মেনে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা।
যেকোনো ধরনের জেদাজেদি, একতরফা সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝি উভয় রাষ্ট্রের জন্যই কেবল ক্ষতির কারণ হবে। সমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় রাষ্ট্রের টেকসই সমৃদ্ধির একমাত্র পরম যৌক্তিক পথ।
লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।
- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভিসি, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক 




















