ঢাকা ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেতুলিয়ার সর্বগ্রাসী গ্রাসে দিশেহারা দশমিনার হাজিরহাটবাসী: ৫ হাজার মানুষের জীবন ও ভিটেমাটি আজ মানচিত্র হারানোর শঙ্কার মুখে

 

চোখের পলকে প্রমত্তা তেতুলিয়া নদীর পেটেই চলে গেল দীর্ঘদিনের চেনা পাকা সড়ক! ভিটেমাটি আর শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাট এলাকার আকাশ-বাতাস। চোখের সামনে পূর্বপুরুষের শেষ সম্বলটুকু নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে বাকরুদ্ধ অসহায় মানুষগুলো। নদীর তীব্র ও আকস্মিক ভাঙনে হাজিরহাটের প্রায় ৫ হাজার মানুষের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুখে পড়েছে।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে দশমিনা সদর ইউনিয়নের হাজিরহাট তেতুলিয়া নদীর লঞ্চঘাট এলাকায় হঠাৎ করেই ভয়ংকর রূপ নেয় নদী। মুহূর্তের মধ্যে হাজিরহাট লঞ্চঘাট থেকে কেদিরহাট পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এই আকস্মিক ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একে একে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে নেওয়ার হিড়িক পড়ে যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।
​সর্বগ্রাসী এই ভাঙনের মুখে পড়ে এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে হাজিরহাট জামে মসজিদ, ঐতিহাসিক কবরস্থান, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাজিরহাট কমিউনিটি ক্লিনিকসহ পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় বুধবার স্থানীয় নুরু মৃধা, নিজাম উদ্দিন ও ফিরোজ হোসেনসহ অন্তত ১০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে স্থানীয় কবরস্থানে; নদীর গর্ভে পূর্বপুরুষদের কবর চলে যাওয়ার আশঙ্কায় স্বজনরা বাধ্য হয়ে তাদের মরদেহ ও হাড়গোড় তুলে নিরাপদ স্থানে দাফন করছেন—যে দৃশ্য দেখে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার প্রতিটি হৃদয়।
​আকস্মিক এই ভয়াবহ ভাঙনের খবর পেয়েই মঙ্গলবার গভীর রাতে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম। প্রশাসনিক তৎপরতায় তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ২৫টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বুধবার দিনভর ভাঙনকবলিত এলাকায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার রোল থামেনি। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভিটেমাটি হারানোর বেদনায় অনেকেই ভেঙে পড়েন কান্নায়।
​এদিকে ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বুধবার সকালে ফুঁসে ওঠে এলাকাবাসী। ভাঙনকবলিত এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আকুতি নিয়ে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় তারা জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
​পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার দিনভর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. আহসান উল্লাহ। তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার এলাকায় ভাঙন রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
​ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। রাতেই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।’
​এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘দশমিনা ও গলাচিপার বেশ কিছু এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। হাজিরহাটের এই ভাঙন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি তাৎক্ষণিকভাবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। ভাঙনকবলিত এলাকায় দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে জনপদকে সুরক্ষিত করতে জোরালো নির্দেশনা দিয়েছি।’
​স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি ভিত্তিতে ও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তেতুলিয়ার ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়ে হাজিরহাটের কয়েক হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ এই জনপদের মূল অবকাঠামোগুলো সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। মুহূর্তের এই মহাদুর্যোগ থেকে হাজিরহাটবাসীকে রক্ষা করতে এখন প্রয়োজন দ্রুততম সময়ে স্থায়ী ও কার্যকরী কূটনৈতিক ও প্রকৌশলগত পদক্ষেপ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

তেতুলিয়ার সর্বগ্রাসী গ্রাসে দিশেহারা দশমিনার হাজিরহাটবাসী: ৫ হাজার মানুষের জীবন ও ভিটেমাটি আজ মানচিত্র হারানোর শঙ্কার মুখে

আপডেট সময় : ০৫:০৫:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

চোখের পলকে প্রমত্তা তেতুলিয়া নদীর পেটেই চলে গেল দীর্ঘদিনের চেনা পাকা সড়ক! ভিটেমাটি আর শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাট এলাকার আকাশ-বাতাস। চোখের সামনে পূর্বপুরুষের শেষ সম্বলটুকু নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে বাকরুদ্ধ অসহায় মানুষগুলো। নদীর তীব্র ও আকস্মিক ভাঙনে হাজিরহাটের প্রায় ৫ হাজার মানুষের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুখে পড়েছে।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে দশমিনা সদর ইউনিয়নের হাজিরহাট তেতুলিয়া নদীর লঞ্চঘাট এলাকায় হঠাৎ করেই ভয়ংকর রূপ নেয় নদী। মুহূর্তের মধ্যে হাজিরহাট লঞ্চঘাট থেকে কেদিরহাট পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এই আকস্মিক ভাঙনের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একে একে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে নেওয়ার হিড়িক পড়ে যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।
​সর্বগ্রাসী এই ভাঙনের মুখে পড়ে এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে হাজিরহাট জামে মসজিদ, ঐতিহাসিক কবরস্থান, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাজিরহাট কমিউনিটি ক্লিনিকসহ পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় বুধবার স্থানীয় নুরু মৃধা, নিজাম উদ্দিন ও ফিরোজ হোসেনসহ অন্তত ১০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে স্থানীয় কবরস্থানে; নদীর গর্ভে পূর্বপুরুষদের কবর চলে যাওয়ার আশঙ্কায় স্বজনরা বাধ্য হয়ে তাদের মরদেহ ও হাড়গোড় তুলে নিরাপদ স্থানে দাফন করছেন—যে দৃশ্য দেখে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার প্রতিটি হৃদয়।
​আকস্মিক এই ভয়াবহ ভাঙনের খবর পেয়েই মঙ্গলবার গভীর রাতে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম। প্রশাসনিক তৎপরতায় তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ২৫টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বুধবার দিনভর ভাঙনকবলিত এলাকায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার রোল থামেনি। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভিটেমাটি হারানোর বেদনায় অনেকেই ভেঙে পড়েন কান্নায়।
​এদিকে ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বুধবার সকালে ফুঁসে ওঠে এলাকাবাসী। ভাঙনকবলিত এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আকুতি নিয়ে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় তারা জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
​পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার দিনভর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. আহসান উল্লাহ। তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার এলাকায় ভাঙন রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
​ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। রাতেই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।’
​এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘দশমিনা ও গলাচিপার বেশ কিছু এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। হাজিরহাটের এই ভাঙন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি তাৎক্ষণিকভাবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। ভাঙনকবলিত এলাকায় দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে জনপদকে সুরক্ষিত করতে জোরালো নির্দেশনা দিয়েছি।’
​স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি ভিত্তিতে ও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তেতুলিয়ার ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়ে হাজিরহাটের কয়েক হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ এই জনপদের মূল অবকাঠামোগুলো সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। মুহূর্তের এই মহাদুর্যোগ থেকে হাজিরহাটবাসীকে রক্ষা করতে এখন প্রয়োজন দ্রুততম সময়ে স্থায়ী ও কার্যকরী কূটনৈতিক ও প্রকৌশলগত পদক্ষেপ।