ঢাকা ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৮ বছরেও চালু হয়নি সোনাহাট সেতু, জমির জটে আটকে ২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরের পাশে নির্মিত নতুন সড়ক সেতুর মূল কাজ শেষ হলেও শুধুমাত্র সংযোগ সড়কের জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে চালু করা যাচ্ছে না সেতুটি। রেলওয়ের জমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে আটকে আছে সোনাহাট প্রান্তের সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ। ফলে আট বছর ধরে ঝুলে আছে ২৩৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সেতু প্রকল্প। এতে একদিকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার লক্ষাধিক মানুষ, অন্যদিকে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত জমির মালিকানা জটিলতার সমাধান করে সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা গেলে সেতুটি চালু হবে। এতে সোনাহাট স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুর ওপর ভারী যানবাহনের চাপও কমবে।
কুড়িগ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় সোনাহাট স্থলবন্দর। বন্দর চালুর পর এলাকায় ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়। স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটে।
তবে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ও একমুখী বঙ্গ সোনাহাট রেলসেতু। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই সেতুতে বর্তমানে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করছে। এতে সেতুটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায়ই সেতুর পাটাতন ভেঙে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটির উভয় পাশে সড়ক বিভাগ ১০ টনের বেশি মালামাল পরিবহন না করার নির্দেশনা দিয়ে সাইনবোর্ড স্থাপন করলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থলবন্দরের পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাকগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ পরিস্থিতিতে পুরোনো রেলসেতুর পাশে নতুন একটি সড়ক সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক বিভাগ। জরাজীর্ণ সেতুটির প্রায় ১২০ মিটার ভাটিতে ২৩৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ স্প্যানবিশিষ্ট ৬৪৫ দশমিক ০১৫ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুন মাসে।
চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনো সেতুটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। ভূরুঙ্গামারী প্রান্তের সংযোগ সড়কও দৃশ্যমান। কিন্তু সোনাহাট প্রান্তে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে সংযোগ সড়কের কাজ থমকে আছে।
জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সড়ক বিভাগ ২০২৩ সালের ১ মার্চ ৭ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রামের কাছে জমা দেয়। এর আগে ২০২২ সালের ৯ মার্চ ভূমি অধিগ্রহণের ৭ ধারা নোটিশ জারি করা হলেও পরবর্তী কার্যক্রমে আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে সোনাহাট ইউনিয়নের গনারকুটি মৌজার কয়েকটি দাগের জমি। স্থানীয় জমির মালিক দাবিদার মোঃ বাবু মিয়া (৪৫) ও মোঃ শফিকুল ইসলাম (৩৫) বলেন, গনারকুটি মৌজার ১০০২, ১০০৩, ১০০৪ ও ১০০৫ দাগের জমি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।
তাদের ভাষ্য, রেল বিভাগ জমিগুলো পূর্বে অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি করলেও এর পক্ষে রেলওয়ের কোনো কাগজপত্র বা গেজেট নেই। জমিগুলো তাদের নামে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত। এমনকি রেল বিভাগের ম্যাপ ও রেকর্ডেও এসব দাগ নেই বলে দাবি করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য রেলওয়ে বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মামলা করা হয়নি।
তবে রেলওয়ের বক্তব্য ভিন্ন। লালমনিরহাটের রেলওয়ে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন জানান, এসব জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কয়েকটি দাগের সম্পত্তি তঞ্চকতার মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এসব সম্পত্তি সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের অধিগ্রহণে কোনো বাধা নেই। রেল ভূমির কেন্দ্রীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটির সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সভা করে কেন্দ্রীয়ভাবে নীতিমালা অনুযায়ী হস্তান্তর করেও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ বলেন, “জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় আমরা বসে আছি। সমস্যার সমাধান হলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করব। বিলম্ব হলে আমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হব।”

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

৮ বছরেও চালু হয়নি সোনাহাট সেতু, জমির জটে আটকে ২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প।

আপডেট সময় : ০৮:৪৫:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরের পাশে নির্মিত নতুন সড়ক সেতুর মূল কাজ শেষ হলেও শুধুমাত্র সংযোগ সড়কের জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে চালু করা যাচ্ছে না সেতুটি। রেলওয়ের জমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে আটকে আছে সোনাহাট প্রান্তের সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ। ফলে আট বছর ধরে ঝুলে আছে ২৩৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সেতু প্রকল্প। এতে একদিকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার লক্ষাধিক মানুষ, অন্যদিকে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত জমির মালিকানা জটিলতার সমাধান করে সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা গেলে সেতুটি চালু হবে। এতে সোনাহাট স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতুর ওপর ভারী যানবাহনের চাপও কমবে।
কুড়িগ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় সোনাহাট স্থলবন্দর। বন্দর চালুর পর এলাকায় ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়। স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটে।
তবে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ও একমুখী বঙ্গ সোনাহাট রেলসেতু। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই সেতুতে বর্তমানে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করছে। এতে সেতুটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায়ই সেতুর পাটাতন ভেঙে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটির উভয় পাশে সড়ক বিভাগ ১০ টনের বেশি মালামাল পরিবহন না করার নির্দেশনা দিয়ে সাইনবোর্ড স্থাপন করলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থলবন্দরের পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাকগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ পরিস্থিতিতে পুরোনো রেলসেতুর পাশে নতুন একটি সড়ক সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক বিভাগ। জরাজীর্ণ সেতুটির প্রায় ১২০ মিটার ভাটিতে ২৩৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ স্প্যানবিশিষ্ট ৬৪৫ দশমিক ০১৫ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুন মাসে।
চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনো সেতুটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। ভূরুঙ্গামারী প্রান্তের সংযোগ সড়কও দৃশ্যমান। কিন্তু সোনাহাট প্রান্তে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে সংযোগ সড়কের কাজ থমকে আছে।
জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সড়ক বিভাগ ২০২৩ সালের ১ মার্চ ৭ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রামের কাছে জমা দেয়। এর আগে ২০২২ সালের ৯ মার্চ ভূমি অধিগ্রহণের ৭ ধারা নোটিশ জারি করা হলেও পরবর্তী কার্যক্রমে আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে সোনাহাট ইউনিয়নের গনারকুটি মৌজার কয়েকটি দাগের জমি। স্থানীয় জমির মালিক দাবিদার মোঃ বাবু মিয়া (৪৫) ও মোঃ শফিকুল ইসলাম (৩৫) বলেন, গনারকুটি মৌজার ১০০২, ১০০৩, ১০০৪ ও ১০০৫ দাগের জমি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।
তাদের ভাষ্য, রেল বিভাগ জমিগুলো পূর্বে অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি করলেও এর পক্ষে রেলওয়ের কোনো কাগজপত্র বা গেজেট নেই। জমিগুলো তাদের নামে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত। এমনকি রেল বিভাগের ম্যাপ ও রেকর্ডেও এসব দাগ নেই বলে দাবি করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য রেলওয়ে বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মামলা করা হয়নি।
তবে রেলওয়ের বক্তব্য ভিন্ন। লালমনিরহাটের রেলওয়ে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন জানান, এসব জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কয়েকটি দাগের সম্পত্তি তঞ্চকতার মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এসব সম্পত্তি সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের অধিগ্রহণে কোনো বাধা নেই। রেল ভূমির কেন্দ্রীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটির সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ সভা করে কেন্দ্রীয়ভাবে নীতিমালা অনুযায়ী হস্তান্তর করেও নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ বলেন, “জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় আমরা বসে আছি। সমস্যার সমাধান হলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করব। বিলম্ব হলে আমরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হব।”