ঢাকা ০৭:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭৫০ কোটি টাকার রেলসম্পদ অরক্ষিত, দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

৭৫০ কোটি টাকার রেলসম্পদ অরক্ষিত, দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিলাহাটি–পার্বতীপুর রেলপথের ১১টি স্টেশনের মধ্যে ৬টি প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ রয়েছে। জনবল সংকটের অজুহাতে একের পর এক স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে দূরের স্টেশন থেকে ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় ও অর্থের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, তেমনি অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে রেলওয়ের শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত স্টেশনগুলো এখন মাদকসেবী, চোর-দুর্বৃত্ত ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চিলাহাটি–পার্বতীপুর রেলপথে পার্বতীপুর, বেলাইচন্ডী, সৈয়দপুর, খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, নীলফামারী, তরুণীবাড়ী, ডোমার, মীর্জাগঞ্জ ও চিলাহাটি—মোট ১১টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, তরুণীবাড়ী, মীর্জাগঞ্জ এবং বেলাইচন্ডী স্টেশন প্রায় ২০ বছর ধরে কার্যক্রমহীন।
বর্তমানে চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী রুটে ছয় জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন এবং একটি মেইল ট্রেন চলাচল করছে। একসময় এই পথে দুটি লোকাল ট্রেন চলাচল করলেও লোকসানের কারণ দেখিয়ে তা বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এরপর পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যায় ছয়টি স্টেশন।
বন্ধ স্টেশনগুলোর কারণে স্থানীয় যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে কয়েক কিলোমিটার দূরের স্টেশনে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে এবং সময়ও নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ।
সরেজমিনে খয়রাতনগর ও দারোয়ানী স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্টেশন ভবন, টিকিট কাউন্টার, স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও যাত্রী বিশ্রামাগার দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক ভবন গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লুপলাইন, সিগন্যাল ব্যবস্থা ও অন্যান্য স্থাপনাও নষ্ট হতে বসেছে। স্টেশনসংলগ্ন রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি বিভিন্ন স্থানে বেদখলের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ধ স্টেশনগুলোর অব্যবহৃত অবকাঠামো, ভবন, রেললাইন ও জমিসহ সম্পদের বর্তমান মূল্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এসব সম্পদ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ কিংবা স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা অহিদুর রহমান বলেন, “খয়রাতনগর স্টেশন থেকে উত্তরা ইপিজেডের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। স্টেশনটি চালু করে ইপিজেড পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা নিয়ে একাধিকবার পরিদর্শন হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।”
দারোয়ানী এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, “স্টেশনটি চালু থাকাকালে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য জমজমাট ছিল। স্টেশন বন্ধ হওয়ার পর এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অনেকটাই কমে গেছে।”
স্থানীয়দের দাবি, বন্ধ স্টেশনগুলো পুনরায় চালু হলে যাত্রীসেবা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি রেলওয়ের বিপুল সম্পদও সুরক্ষিত থাকবে।
সৈয়দপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন বলেন, “বর্তমানে উত্তরা লোকাল ট্রেন শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত চলাচল করে। ট্রেনটি চিলাহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে বন্ধ স্টেশনগুলো আবার চালু করা সম্ভব। একই সঙ্গে উত্তরা লোকাল ও রকেট মেইল ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া যাবে। এতে যাত্রীসেবা বৃদ্ধি পাবে, বিনা টিকিটে ভ্রমণ কমবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।”
দীর্ঘ দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা এসব স্টেশন পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার এবং স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগকে আরও গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

৭৫০ কোটি টাকার রেলসম্পদ অরক্ষিত, দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিলাহাটি–পার্বতীপুর রেলপথের ১১টি স্টেশনের মধ্যে ৬টি প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ রয়েছে। জনবল সংকটের অজুহাতে একের পর এক স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে দূরের স্টেশন থেকে ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় ও অর্থের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, তেমনি অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে রেলওয়ের শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত স্টেশনগুলো এখন মাদকসেবী, চোর-দুর্বৃত্ত ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চিলাহাটি–পার্বতীপুর রেলপথে পার্বতীপুর, বেলাইচন্ডী, সৈয়দপুর, খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, নীলফামারী, তরুণীবাড়ী, ডোমার, মীর্জাগঞ্জ ও চিলাহাটি—মোট ১১টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, তরুণীবাড়ী, মীর্জাগঞ্জ এবং বেলাইচন্ডী স্টেশন প্রায় ২০ বছর ধরে কার্যক্রমহীন।
বর্তমানে চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী রুটে ছয় জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন এবং একটি মেইল ট্রেন চলাচল করছে। একসময় এই পথে দুটি লোকাল ট্রেন চলাচল করলেও লোকসানের কারণ দেখিয়ে তা বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এরপর পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যায় ছয়টি স্টেশন।
বন্ধ স্টেশনগুলোর কারণে স্থানীয় যাত্রীদের ট্রেনে উঠতে কয়েক কিলোমিটার দূরের স্টেশনে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে এবং সময়ও নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ।
সরেজমিনে খয়রাতনগর ও দারোয়ানী স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্টেশন ভবন, টিকিট কাউন্টার, স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও যাত্রী বিশ্রামাগার দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক ভবন গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লুপলাইন, সিগন্যাল ব্যবস্থা ও অন্যান্য স্থাপনাও নষ্ট হতে বসেছে। স্টেশনসংলগ্ন রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি বিভিন্ন স্থানে বেদখলের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ধ স্টেশনগুলোর অব্যবহৃত অবকাঠামো, ভবন, রেললাইন ও জমিসহ সম্পদের বর্তমান মূল্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এসব সম্পদ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ কিংবা স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা অহিদুর রহমান বলেন, “খয়রাতনগর স্টেশন থেকে উত্তরা ইপিজেডের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। স্টেশনটি চালু করে ইপিজেড পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা নিয়ে একাধিকবার পরিদর্শন হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।”
দারোয়ানী এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, “স্টেশনটি চালু থাকাকালে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য জমজমাট ছিল। স্টেশন বন্ধ হওয়ার পর এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অনেকটাই কমে গেছে।”
স্থানীয়দের দাবি, বন্ধ স্টেশনগুলো পুনরায় চালু হলে যাত্রীসেবা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি রেলওয়ের বিপুল সম্পদও সুরক্ষিত থাকবে।
সৈয়দপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন বলেন, “বর্তমানে উত্তরা লোকাল ট্রেন শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত চলাচল করে। ট্রেনটি চিলাহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে বন্ধ স্টেশনগুলো আবার চালু করা সম্ভব। একই সঙ্গে উত্তরা লোকাল ও রকেট মেইল ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া যাবে। এতে যাত্রীসেবা বৃদ্ধি পাবে, বিনা টিকিটে ভ্রমণ কমবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।”
দীর্ঘ দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা এসব স্টেশন পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার এবং স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগকে আরও গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।