ঢাকা ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট: গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

  • আপডেট সময় : ১১:৫৪:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • 37

স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৫ আগস্ট এক স্মরণীয় দিন। অনেকের দৃষ্টিতে এটি আনন্দ, বিজয় এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে—এমন মূল্যায়ন করেন এ দিনের সমর্থকেরা। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করে। এরপর থেকে দিনটি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এই দিনটি স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, আলোচনা সভা এবং নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপিসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের নেতাকর্মীরা গুম, খুন, অপহরণ, হামলা, মামলা এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলাগুলোও সেই সময়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম।
সে সময় ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালার অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ সামনে আসে এবং বহু ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার ঘটনাও আলোচনায় ছিল। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম. ইলিয়াস আলী ও ঢাকার সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ অনেকের সন্ধান আজও মেলেনি।
সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কার্যকারিতা হারায় এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নানা সংকট তৈরি হয় বলে বিভিন্ন মহল অভিযোগ করে।
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং লুটপাটের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। এসব কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বলে বিশ্লেষকদের মত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, নারী ও শিশু—সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। আন্দোলন দমনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
রংপুরের আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম, ঢাকার মুগ্ধসহ বহু নিহত ব্যক্তি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও গণতন্ত্রের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়। এ দিনের ঘটনাবলি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে—এ বিষয়ে অনেকেই একমত আজকের এই দিনে দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায় হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
রক্তে অর্জিত জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে সেই মতপার্থক্য যেন কখনো বিভাজন, সহিংসতা বা শত্রুতার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের পুনরাবৃত্তি না ঘটুক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।
১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালকে অনেকে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন। ইতিহাসের প্রতিটি আত্মত্যাগ জাতির স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

৫ আগস্ট: গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার

আপডেট সময় : ১১:৫৪:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৫ আগস্ট এক স্মরণীয় দিন। অনেকের দৃষ্টিতে এটি আনন্দ, বিজয় এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে—এমন মূল্যায়ন করেন এ দিনের সমর্থকেরা। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করে। এরপর থেকে দিনটি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এই দিনটি স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, আলোচনা সভা এবং নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপিসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের নেতাকর্মীরা গুম, খুন, অপহরণ, হামলা, মামলা এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলাগুলোও সেই সময়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম।
সে সময় ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালার অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ সামনে আসে এবং বহু ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার ঘটনাও আলোচনায় ছিল। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম. ইলিয়াস আলী ও ঢাকার সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ অনেকের সন্ধান আজও মেলেনি।
সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কার্যকারিতা হারায় এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নানা সংকট তৈরি হয় বলে বিভিন্ন মহল অভিযোগ করে।
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং লুটপাটের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। এসব কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বলে বিশ্লেষকদের মত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, নারী ও শিশু—সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। আন্দোলন দমনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
রংপুরের আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম, ঢাকার মুগ্ধসহ বহু নিহত ব্যক্তি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও গণতন্ত্রের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়। এ দিনের ঘটনাবলি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে—এ বিষয়ে অনেকেই একমত আজকের এই দিনে দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায় হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
রক্তে অর্জিত জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে সেই মতপার্থক্য যেন কখনো বিভাজন, সহিংসতা বা শত্রুতার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের পুনরাবৃত্তি না ঘটুক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।
১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালকে অনেকে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন। ইতিহাসের প্রতিটি আত্মত্যাগ জাতির স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান থাকবে।