গণতন্ত্রের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকটে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাচন, সরকার পরিচালনা ও বিরোধী রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে আজ দলটির সামনে নতুন বাস্তবতা—রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি জনগণের দৈনন্দিন সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই অতীতের রাজনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি বর্তমানের জনজীবনের সমস্যা সমাধানেও দলীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ, কৃষকের সারপ্রাপ্তি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সেবা—এসব বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও আরও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন—এমন অবস্থানের কথা তুলে ধরে বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারের উদ্যোগকে সফল করতে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে রেখে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলে।
১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন, আশির দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় দলটিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। একই সঙ্গে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন-সংগ্রাম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মাঠে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনার সময় একটি দলের দায়িত্ব বিরোধী দলের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। জনগণের সমস্যা চিহ্নিত করা, দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সমাধানের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা এখন তৃণমূল নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে।
কোন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা, কোথায় গ্যাসের সংকট, কোন অঞ্চলের কৃষক সার পাচ্ছেন না কিংবা কোথায় দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক—এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায় থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরলে সমস্যা সমাধানের পথ আরও সহজ হতে পারে।
বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে সার ও কৃষি উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ডিলারের অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ থাকলে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে বিষয়টি আড়াল না করে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানোই হতে পারে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ।
‘সরকারের পাশে থাকা’ মানে জনগণের পাশে থাকা
সরকারকে সহযোগিতা করা মানে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করা নয়। বরং জনগণের সমস্যা সরকারের কাছে তুলে ধরা, বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের অবহিত করা এবং প্রয়োজন হলে ভুল-ত্রুটি সংশোধনের পরামর্শ দেওয়াই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা হতে পারে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের তাই শুধু সভা-সমাবেশ বা সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের কাছে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান উঠেছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত জনসংযোগ, অভিযোগ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পোস্টার-ব্যানারের বাইরে জনসম্পৃক্ততার রাজনীতি
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় রাজনৈতিক শক্তিকে জনসেবার কাজে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, প্রশাসনিক সেবা পেতে সহযোগিতা করা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে দূরে থাকাই পারে তৃণমূলে রাজনৈতিক আস্থা আরও শক্তিশালী করতে।
কারণ সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক স্লোগানের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধান চায়। বিদ্যুৎ না থাকলে বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ, কৃষক সার না পেলে সরবরাহব্যবস্থা যাচাই, রাস্তা বা চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা—এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগই জনগণের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে,কিন্তু জেলা উপজেলার নেতাদের এরকম কোন কর্মসূচি চোখে পড়েছে কিনা সোনা যায়নি বা চোখে পড়েনি।
সামনে জনসেবার অঙ্গীকার
৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস। তবে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ হলো সেই রাজনৈতিক শক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট মোকাবিলায় কাজে লাগানো।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে—এই উদ্যোগকে সফল করতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরও আরও দায়িত্বশীল, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা রাখতে হবে।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির সামনে মূল বার্তা হতে পারে—ইতিহাসের গৌরবকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সংকটে সহযোগিতা করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করা।
রাজনীতির চূড়ান্ত সাফল্য শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়; জনগণের সমস্যা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধান করা যাচ্ছে, তার ওপরই সেই সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে
৪৮ বছরে বিএনপি: ইতিহাসের গৌরব পেরিয়ে জনসেবার নতুন পরীক্ষা
-
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ - আপডেট সময় : ০৪:৩৭:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- 37
জনপ্রিয় সংবাদ




















