বয়স আশির কোঠায়। চোখে ছানি, কানে কম শোনেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা হয়েছে। নানা শারীরিক জটিলতায় ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। এমনকি একবেলা খাবার জোগাড় করতেও এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয় মনোয়ারা বেগমকে।
প্রায় ৩০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে তাঁর। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দালাল বাড়িতে স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট ভিটায় একাই থাকেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অভাব, অসুস্থতা আর একাকিত্বই যেন তাঁর নিত্যসঙ্গী।
মনোয়ারা বেগমের তিন মেয়ে—ফেরদৌসী (৪০), রিপা (৩৫) ও মালা (৩০)। তিনজনেরই বিয়ে হয়েছে। নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। ফলে অসুস্থ ও বৃদ্ধ মায়ের নিয়মিত দেখাশোনা কিংবা চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই তাঁদের।
সম্প্রতি বাউফল গোরস্তান সড়কের একটি ভাতের হোটেলের সামনে দেখা যায় মনোয়ারা বেগমকে। একবেলা খাবারের আশায় পথচারীদের কাছে আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি। কথা বলতে গেলে উঠে আসে তাঁর দীর্ঘদিনের কষ্ট আর অসহায় জীবনের গল্প।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘চোখে ভালো দেখি না, কানেও কম শুনি। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ঘা হয়েছে। মুখ, গলা, জরায়ু ও পেটেও সমস্যা আছে। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। অপারেশন করানোর কথা থাকলেও টাকার অভাবে করাতে পারিনি।’
খাবারের বিষয়ে তিনি বলেন, কখনো মানুষের দেওয়া খাবারে দিন চলে, আবার কখনো না খেয়েই থাকতে হয়। বয়স ও অসুস্থতার কারণে নিজের প্রয়োজনীয় কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সফিজ সিকদার বলেন, ‘মনোয়ারা বেগমের মতো অসহায় প্রবীণদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনা দরকার। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং চোখের ছানি অপারেশন করানো গেলে শেষ বয়সে কিছুটা স্বস্তি পাবেন তিনি।’
স্থানীয় যুবক সুমন বলেন, ‘এই বয়সে এসেও মনোয়ারা বেগম কোনো বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা পান না—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর মতো অসহায় মানুষ সরকারি সহায়তার বাইরে থাকলে কারা এসব সুবিধা পাচ্ছেন, সেটিও দেখা দরকার।’
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, ‘সরকারি সুবিধা পেতে হলে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। মনোয়ারা বেগম হয়তো এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তিনি আবেদন করলে তাঁকে বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিএফ বা ভিজিডির আওতায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত। তবে বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ রয়েছে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘আপাতত আমার এখতিয়ারের মধ্যে থেকে তাঁকে সাধ্যমতো সহায়তা প্রদান করব। তাঁর সঠিক অবস্থান বা লোকেশন জানালে বাড়িতে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’
প্রায় তিন দশক আগে স্বামীকে হারানো মনোয়ারা বেগমের এখন জীবনের শেষ চাওয়া খুব বেশি নয়—চিকিৎসার সুযোগ আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা। অসুস্থ শরীর নিয়ে মানুষের দুয়ারে দাঁড়িয়ে সেই সামান্য চাওয়াটুকুই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আকুতি।
মোঃ আব্দুল্লাহ আল লিখন বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি 



















