(القارعة) পবিত্র কুরআনের ১০১ নম্বর সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর আয়াত সংখ্যা ১১টি। “ক্বারি’আহ” শব্দের অর্থ হলো—মহাপ্রলয়, আঘাতকারী বা করাঘাতকারী। কেয়ামতের ভয়াবহতা এবং মানুষের চূড়ান্ত পরিণতির কথা এই সূরায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নিচে সূরা আল-ক্বারি’আহর আয়াতভিত্তিক সহজ তাফসির ও বিষয়বস্তু আলোচনা করা হলো:
আয়াত ১ – ৩: কেয়ামতের ভয়াবহ ঘোষণা
১. اَلْقَارِعَةُ (আল-ক্বারি‘আহ)
অর্থ: মহাপ্রলয়।
২. مَا الْقَارِعَةُ (মাল ক্বারি‘আহ)
অর্থ: মহাপ্রলয় কী?
৩. وَ مَاۤ اَدْرٰىكَ مَا الْقَارِعَةُ (ওয়া মা আদরাকা মাল ক্বারি‘আহ)
অর্থ: আপনি কি জানেন মহাপ্রলয় কী?
তাফসির:
সূরাটি শুরুই হয়েছে একটি গম্ভীর ও সজাগকারী শব্দ “আল-ক্বারি’আহ” দিয়ে। এটি কেয়ামতের একটি নাম। কেয়ামতকে “আঘাতকারী” বলা হয়েছে কারণ এর ভয়াবহ আওয়াজ ও বিপর্যয় মানুষের অন্তরকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করবে এবং পুরো মহাবিশ্বের চেনা রূপ ভেঙে চুরমার করে দেবে। আল্লাহ তাআলা পরপর তিনটি আয়াতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে এর ভয়াবহতার গভীরতা বোঝাতে চেয়েছেন, যেন মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি উপলব্ধি করে।
আয়াত ৪ – ৫: প্রলয়ের দিন সৃষ্টির অবস্থা
৪. يَوْمَ يَكُوْنُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوْثِ (ইয়াওমা ইয়াকূনুন-নাসু কাল ফারাশিল মাবছূছ)
অর্থ: যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো,
৫. وَ تَكُوْنُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوْشِ (ওয়া তাকূনুল জিবালু কাল ‘ইহনিল মানফূশ)
অর্থ: এবং পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো।
তাফসির:
এই দুটি আয়াতে কেয়ামত দিবসের দুটি ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে:
মানুষের অবস্থা (আয়াত ৪): আগুনের চারপাশে পোকা-মাকড় বা পতঙ্গ যেভাবে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি করে, কেয়ামতের দিন ভয়ে এবং আতঙ্কে মানুষও তেমনি হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকবে। কেউ কারও কোনো উপকারে আসবে না।
পাহাড়ের অবস্থা (আয়াত ৫): পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত ও অটল সৃষ্টি হলো পাহাড়। কিন্তু সেদিন আল্লাহর আদেশে সেই বিশাল পাহাড়গুলো তুলো বা পশম ধুনলে যেভাবে বাতাসে উড়ে বেড়ায়, সেভাবে ধূলিকণার মতো উড়তে থাকবে।
আয়াত ৬ – ৯: মিযান (আমলনামা পরিমাপ) এবং মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি
৬. فَاَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِيْنُهٗ (ফাআম্মা মান ছাকুলাত মাওয়াযীনুহ)
অর্থ: অতঃপর যার (নেকের) পাল্লা ভারী হবে,
৭. فَهُوَ فِيْ عِيْشَةٍ رَّاضِيَةٍ (ফাহুওয়া ফী ‘ঈশাতীর-রাদিয়াহ)
অর্থ: সে যাপন করবে এক সন্তোষজনক জীবন।
৮. وَ اَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِيْنُهٗ (ওয়া আম্মা মান খাফফাত মাওয়াযীনুহ)
অর্থ: আর যার (নেকের) পাল্লা হালকা হবে,
৯. فَاُمُّهٗ هَاوِيَةٌ (ফাউম্মুহু হাবিয়াহ)
অর্থ: তার ঠিকানা হবে ‘হাবিয়াহ’ (জাহান্নাম)।
তাফসির:
মহাপ্রলয়ের পর হিসাব-নিকাশের পালা আসবে। সেখানে মানুষের ভালো ও মন্দ কাজ পরিমাপ করা হবে।
সফল ব্যক্তি: যাদের ঈমান ও সৎ কাজের (নেক আমল) পাল্লা ভারী হবে, তারা লাভ করবে চিরস্থায়ী জান্নাত। সেখানে তারা এমন এক চমৎকার ও আরামদায়ক জীবন পাবে, যা তাদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করবে।
ব্যর্থ ব্যক্তি: যাদের ভালো কাজের পাল্লা হালকা হবে (অর্থাৎ পাপের পাল্লা ভারী হবে), তাদের আশ্রয়স্থল হবে ‘হাবিয়াহ’। এখানে “উম্মুহু” (তার মা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সন্তান যেমন বিপদে পড়লে মাকে আঁকড়ে ধরে, তেমনি এই পাপিষ্ঠদের পরম আশ্রয় ও আলিঙ্গন করার জায়গা হবে জাহান্নাম।
আয়াত ১০ – ১১: হাবিয়াহ-র পরিচয়
১০. وَ مَاۤ اَدْرٰىكَ مَا هِيَهْ (ওয়া মা আদরাকা মা হিয়াহ)
অর্থ: আপনি কি জানেন তা কী?
১১. نَارٌ حَامِيَةٌ (নারুন হামিয়াহ)
অর্থ: তা হলো এক অতি উত্তপ্ত আগুন!
তাফসির:
সর্বশেষ দুটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা হাবিয়াহ কী, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এটি হলো এক লেলিহান ও চরম উত্তপ্ত আগুন। দুনিয়ার আগুনের চেয়ে আখেরাতের জাহান্নামের আগুন বহুগুণ তীব্র ও ভয়াবহ।
সূরার মূল শিক্ষা:
১. কেয়ামত ও পরকাল সত্য, যা একদিন আকস্মিকভাবেই আমাদের সামনে হাজির হবে।
২. দুনিয়ার ক্ষমতা, সম্পদ বা অহংকার সেদিন কোনো কাজে আসবে না।
৩. মানুষের আসল সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করছে তার আমলের পাল্লা ভারী বা হালকা হওয়ার ওপর।
৪. তাই দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনে বেশি বেশি সৎ কাজ ও ইবাদতের মাধ্যমে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূরা আল-ক্বারি’আয়াত ও তাফসির।
-
নিজস্ব প্রতিবেদন, মোঃ হাসান,, খতিব আশরাফিয়া জামে মসজিদ দক্ষিণ কেরোয়া রায়পুর, লক্ষ্মীপুর। - আপডেট সময় : ০৯:২৫:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
- 55
জনপ্রিয় সংবাদ




















