আল আফাজঃ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি।
সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলায় একই রাস্তায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় পিআইও অফিস এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের পৃথক দুটি প্রকল্পের নামে সরকারের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নজিরবিহীন অনিয়ম দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে ৩ ভাইয়ের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ভ্রাতারা হলেন উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বাদে-গোরেশপুর গ্রামের মৃত মাহমুদ আলীর ৩ পুত্র যথাক্রমে হেলাল উদ্দিন ওরফে মাসুম হেলাল ও তার ছোট ভাই মিজান উদ্দিন এবং বড় ভাই নুর উদ্দিন। অভিযোগে প্রকাশ,দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় (পিআইও অফিস) এর আওতায় চলতি ২০২৫-২৬ইং অর্থ বছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ (টিআর) সাধারণ-১ম পর্যায় কর্মসুচির অংশ হিসেবে বাদে গোরেশপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক হয়ে ছাতক আমবাড়ী রাস্তা পর্যন্ত মেরামত কাজে মাটি ভরাটের জন্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়। মঞ্জুরকৃত টাকায় মাটি ভরাটপূর্বক রাস্তা মেরামতের জন্য মাসুম হেলাল তার বড় ভাই সাবেক মেম্বার নুর উদ্দিনের মাধ্যমে,দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ৭,৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যা মিরারানী নাথকে সভাপতি ও তাদের আত্মীয় মোঃ আবু সোহেলকে সেক্রেটারী করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে। দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উক্ত প্রকল্প নং ৫৩। প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ৫০ ভাগ হিসেবে পিআইও অফিস থেকে ষাট হাজার টাকা অগ্রিম গ্রহন করেন সাবেক মেম্বার নুর উদ্দিন। দায়সারাভাবে মাত্র ২০ হাজার টাকার কাজ করে বাকী টাকা পকেটস্থ করে নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ইউপি সদস্যাকে মাত্র ৩ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। বাকী টাকা এখনও নুর উদ্দিনের কাছে রয়েছে বলে জানান গোরেশপুর গ্রামের লোকজন ও প্রকল্প কমিটির সকল সদস্যরা। অন্যদিকে ঠিক একই রাস্তায় “দোয়ারাবাজার উপজেলাধীন তেরাবিল হাওর ০.০০০কিলোমিটার হতে ২.০২০ কিলোমিটার মোট ২০২০.০০ মিটার ডুবন্ত বাঁধের ভাঙ্গা বন্ধকরন ও পুনরাকৃতি কাজ” নামে স্কীম উল্লেখপূর্বক পানি উন্নয়ন বোর্ডের দোয়ারাবাজার থানার ২১ নং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ভাগিয়ে নেন মাসুম হেলাল। মাসুম হেলালের নির্দেশমতে উক্ত পিআইসির সভাপতি করা হয় তার আপন ছোট ভাই মিজান উদ্দিনকে। ৭ সদস্যবিশিষ্ট একই পিআইসির সদস্যসচিব করা হয় নুর উদ্দিন মেম্বারের শ্যালক মোঃ মোজাহিদুল ইসলামকে। পাউবোর কথিত ও অপ্রয়োজনীয় ঐ ২১ নং পিআইসির নামে ভাগিয়ে নেয়া হয় ২২.৮২ লক্ষ টাকা। অথচ পিআইসির কাজের কাজ বলতে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকার কাজ করে ইতিমধ্যে বরাদ্দকৃত অর্থের ৩০ ভাগ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মাসুম হেলাল ও তার সহোদর মিজান উদ্দিন।
অভিযোগ উঠেছে,২০২৪ইং সনের ১২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের নতুন সাহেবেরচর গ্রামের বাসিন্দা এম.এ মালেক এর পুত্র ড.মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। তার যোগদানের পর থেকে ঐ জেলা প্রশাসকের নামডাক জাহির করার জন্য পোষ্য সাংবাদিক মাসুম হেলাল নিজেকে জামাত কর্মী পরিচয় দিয়ে ডিসির সাথে গোপন সখ্যতা গড়ে তেলবাজীর মাধ্যমে তার কাছ থেকে নানাভাবে সুবিধা গ্রহন করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের শাসনামলে প্রতিপক্ষ সাংবাদিকদের ঘায়েল করা এবং গ্রেফতার ও মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে পরিকল্পিত খুন গুমে সুনামগঞ্জ জেলার গুপ্ত বাহিনীর প্রধান হিসেবে সক্রিয় রয়েছে মাসুম হেলাল। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা গ্রহন করা থেকে বিরত থাকেন ড.ইলিয়াস। এরই ধারাবাহিকতায়,স্থানীয় জনসাধারণ ও ইউনিয়ন পরিষদের কোনপ্রকার মতামত ছাড়াই একক ক্ষমতাবলে এবং জেলা কাবিটা স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকল্পে গঠিত জেলা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি সুনামগঞ্জ এর সভাপতি পদটির অপব্যবহার করে ডিসি ইলিয়াস,মাসুম হেলাল এর ব্যক্তিগত লাভে ও স্বার্থে তার আপন ভাই মিজান উদ্দিনকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এর সভাপতি ঘোষণা ক্রমে,দোয়ারাবাজার উপজেলার ২১ নং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি অনুমোদন করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটিকে বাধ্য করেন। ডিসির বেআইনী সহযোগীতা পেয়ে দোহালিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড এলাকায় একটি অপ্রয়োজনীয় ফসলরক্ষা বাঁধ স্থাপনে সচেষ্ট হয়ে মিজান উদ্দিন ও তার ভাই মাসুম হেলাল তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সর্বোচ্চ ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ মঞ্জুর করত: ইতিমধ্যে মঞ্জুরকৃত বরাদ্দের শতকরা ৩০ ভাগ টাকা পকেটস্থ করে। ডিসি অধীনস্থ সরকারী কর্মচারীদেরকে বাধ্য করে, তাদেরকে অপ্রয়োজনীয় পিআইসির নামে টাকা প্রদান করত: দুর্নীতি ও লুটতরাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তাদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা দেন। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ডিসির সহায়তায় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিলেও মাত্র ১ লাখ টাকার মাটি কেটে তাদের বাড়ীতে যাওয়ার জন্য একটি গ্রামীণ সড়কের সামান্য কাজ সম্পন্ন করেছে ঐ দুই সহোদর। অথচ বর্ণিত এলাকায় বেশিরভাগ জমিই আমন ফসলি জমি। এছাড়া এর আগে এই জায়গায় পাউবো কখনও কোন পিআইসি অনুমোদন করেনি। কথিত ২১ নং পিআইসির আওতায় গৃহীত অপ্রয়োজনীয় পারিবারিক বাঁধকাম রাস্তাটি দোয়ারাবাজার উপজেলা কাবিটা স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকল্পে গঠিত উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির নির্ধারিত এ্যালাইনমেন্টের বাইরে ছিল। বিশেষ করে গত অর্থ বছরে দোয়ারাবাজার উপজেলায় পিআইসির সংখ্যা ছিল ৪৭টি। গতবারের নির্মিত বাঁধগুলো অক্ষত থাকায় এবার অর্ধেকেরও বেশি অপ্রয়োজনীয় পিআইসি বাতিল করেছে উপজেলা কমিটি। কিন্তু সকলের চোখকে ফাকি দিয়ে স্থানীয় প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে ২১নং পিআইসির কাজ ভাগিয়ে নিয়েছে ঐ প্রতারকচক্রটি। একইভাবে মাসুম হেলাল তার বাড়ী ও গ্রামের রাস্তায় ডিসি ইলিয়াসকে ব্যবহার করে টিআর কর্মসুচির আওতায় পিআইও অফিস হতেও প্রকল্প ভাগিয়ে নেয় এবং তার নিজের বড় ভাই সাবেক মেম্বার নুর উদ্দিনের সহায়তায় দায়সারাভাবে প্রকল্পের কাজ আংশিক সম্পন্ন করে বাকী টাকা পকেটস্থ করে। ৩ সহোদরের দুর্নীতির কথা স্বীকার করে দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শামীমুল ইসলাম বলেন,টিআর প্রকল্প কমিটি গঠনের জন্য মাসুম হেলাল ও তার বড় ভাই নুর উদ্দিন আমাকে অনুরোধ করলে আমি তাদের অনুরোধে এলাকার চেয়ারম্যান হিসেবে কমিটি অনুমোদনে লিখিত সুপারিশ করি। কিন্তু প্রকল্প কমিটি গঠন ও কাজ বাস্তবায়ন এবং চেক মারফতে প্রকল্পের অর্ধেক টাকা গ্রহন ইত্যাদি তারা দুই ভাই যথাক্রমে মাসুম হেলাল ও তার বড় ভাই নুর উদ্দিন সবকিছু করেছেন। ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য মোঃ আলী হোসেন বলেন,যে রাস্তাটিতে গত কয়েক বছর ধরে একাধিকবার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের চাল গম ও নগদ টাকার বরাদ্দ দ্বারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করত: মাটি ভরাট করা হয়েছে সেই একই রাস্তায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পিআইসি কার্যক্রম চলতে পারেনা। তাছাড়া রাস্তার দুপাশে কোন বোরো জমি নেই। শুধুমাত্র আমন জমি রয়েছে এখানে। অপ্রয়োজনীয় পিআইসি নিয়ে ছোট ভাই মিজান উদ্দিনের দ্বারা ২১নং পিআইসি অনুমোদন করার নামে তারা পিআইসি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় উপকারভোগীরা বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাড়ে ১৬ টন চাল গম বরাদ্দ দ্বারা কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের আওতায় আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব ও মেম্বার সাহেবরা পুরো পরিষদকে নিয়ে যে রাস্তাটি নির্মাণ করেছেন,প্রতারক মাসুম হেলাল তার ভাই মিজান উদ্দিন কে সভাপতি ও তাদের উভয়ের বড়ভাই নুর উদ্দিনের শ্যালক মোজাহিদুল ইসলামকে সেক্রেটারী সাজিয়ে কাল্পনিক ও ভৌতিক ২১নং পিআইসি ভাগিয়ে নিয়ে একই রাস্তায় মাটির প্রলেপ দিয়ে সরকারের বরাদ্দ লুটতরাজ করেছে। আমরা এর উপযুক্ত বিচার চাই। কথিত পিআইসির সদস্য মোঃ আবুল বশর বলেন,মাসুম হেলাল আমাদের এলাকার উন্নয়নের কথা বলে আমাদের কাছ থেকে জমিজমার কাগজপত্র নেয়। পরে শুনি এলাকায় একটি পিআইসি অনুমোদন করিয়েছে। অথচ কথিত পিআইসির কমিটিতে আমি সদস্য থাকলেও কার্যত নেই। পিআইসির ৭ জনের মধ্যে আমরা ৬ জনই কথিত পিআইসি প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানিনা। সবকিছুই একা একা করছে মাসুম হেলাল ও তার ভাই মিজান উদ্দিন। ঐ পিআইসির আরো এক কিলোমিটার জায়গায় এখনও মাটি ভরাট করা হয়নি বলে জানান আবুল বশর। এদিকে অপ্রয়োজনীয় পিআইসির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে রাষ্ট্রের টাকা লুটতরাজের দায়ে অবিলম্বে ২১নং পিআইসি বাতিলসহ অবৈধ সুবিধাভোগী মাসুম হেলাল ও তার ভাই মিজানচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়েছেন উপজেলাবাসী।
আল আফাজঃ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি। 



















