চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চাকমা রাজাদের ঐতিহাসিক রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। একসময় চাকমা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই রাজানগর এখন অবহেলা, অযত্ন ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের শেষ স্মৃতিচিহ্নগুলো। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনেও রাজবাড়িটির জীর্ণদশা ও সংরক্ষণের অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইট, চুন ও সুরকির তৈরি প্রাচীন স্থাপনাটির দেয়াল ও পলেস্তারা অনেক জায়গায় খসে পড়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ আগাছা ও লতা-গুল্মে ঢেকে গেছে। রাজবাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার নানা চিহ্ন। একসময় এই রাজপ্রাঙ্গণে রাজদরবার, পিলখানা, দীঘি, দালান-কোঠা ও ধর্মীয় স্থাপনা ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে এসবের অনেক কিছুই বিলুপ্ত অথবা ধ্বংসপ্রায়।
চাকমা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগ থেকেই রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে চাকমা রাজাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা শেরমস্ত খাঁ রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ও কোদালা এলাকার কিছু পাহাড়ি ভূমি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন বলে ইতিহাস গবেষক জামাল উদ্দিনের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে চাকমা রাজা জানবক্স খাঁর শাসনামলে রাজ্যের রাজধানী আলীকদম থেকে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরে স্থানান্তরিত হয় বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর শাসনকাল ১৭৮২ থেকে ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বলে বাংলাপিডিয়া ও অন্যান্য সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজানগরের রাজপ্রাসাদের মূল স্থাপত্যের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজও তাঁর আমলে সম্পন্ন হয়েছিল বলে একটি ঐতিহ্যবিষয়ক সূত্রে উল্লেখ আছে।
রাজানগর পরবর্তীকালে চাকমা রাজপরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮৭৪ সালে চাকমা রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় রাজ্যের রাজধানী রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর থেকে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কালিন্দী রানীর ইতিহাস
রাজানগরের ইতিহাসে চাকমা রানি কালিন্দী দেবীর শাসনকাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে প্রজাবান্ধব ও বিচক্ষণ শাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সময়কার ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনার কিছু নিদর্শনও এ অঞ্চলে রয়েছে।
রাজানগর এলাকায় প্রাচীন দীঘি ও বৌদ্ধ স্থাপনার অস্তিত্বের কথাও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া রাঙ্গুনিয়ার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় রাজানগরের সাগরদিঘী ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর উল্লেখ করেছে।
৫২ একরের দাবিতেও রয়েছে অসঙ্গতি
রাজবাড়িটি ৫২ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়েছিল—এমন তথ্য বিভিন্ন লেখায় প্রচলিত। তবে অন্য একটি প্রতিবেদনে বর্তমানে রাজপ্রাসাদের অবশিষ্ট অংশের জমির পরিমাণ ১২ দশমিক ২০ শতক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৫২ একর পুরো রাজকীয় কমপ্লেক্সের ঐতিহাসিক পরিসর নাকি শুধু মূল প্রাসাদের জমি—তা প্রামাণ্য নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
একইভাবে রাজবাড়িটিকে সরাসরি ‘সপ্তদশ শতাব্দীর প্রাসাদ’ হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। যাচাই করা সূত্রগুলোতে ১৭৩৭ সাল থেকে এ অঞ্চলে চাকমা রাজাদের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে জানবক্স খাঁর আমলে রাজানগরকে রাজধানী করার তথ্য পাওয়া গেলেও সপ্তদশ শতাব্দীতে বর্তমান রাজপ্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল—এমন নিশ্চিত প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে ‘প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক চাকমা রাজবাড়ি’ বলা অধিকতর নিরাপদ।
সংরক্ষণের উদ্যোগ কোথায়?
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজবাড়ির স্থাপত্য নিদর্শনগুলো দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি দলের রাজপ্রাসাদ ও আশপাশের স্থাপনা নিয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা, মাপজোখ ও অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে ভবিষ্যতে এলাকাটিকে আদিবাসী ভিলেজ ও রয়্যাল মিউজিয়ামে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও সমীক্ষার কথা বলা হয়।
তবে ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে রাজবাড়িটি এখনো সংরক্ষণের অভাবে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ার কথা উঠে এসেছে। আর ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও জীর্ণ দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা ও আগাছায় ঢেকে যাওয়া প্রাঙ্গণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমী ও বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণকাজ শুরু করা হলে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে রাজবাড়ি, প্রাচীন দীঘি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করে একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই রাজবাড়ি তাই এখন শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়—এটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, চাকমা রাজপরিবার এবং এ অঞ্চলের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। যথাসময়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে এই স্মৃতিচিহ্নও একদিন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি ওমর ফারুক। 



















