ঢাকা ০৩:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিবালয়ের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সেবা এখনো স্বপ্ন

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তার ঘটলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, লোডশেডিং এবং কিছু এলাকায় ভোল্টেজ সমস্যায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
শিবালয় উপজেলার সাত ইউনিয়ন—মহাদেবপুর, শিবালয়, উলাইল, উথলী, শিমুলিয়া, আরুয়া ও তেওতা—এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উপকেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ের অফিস রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজও চলছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবার প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে এর বড় উদাহরণ দেখা যায় ২২ আগস্ট। ওইদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় শিবালয়ের প্রায় অর্ধলক্ষ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরাও সমস্যায় পড়েন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। কারণ রোগীর ওয়ার্ড, আলো, ফ্যান, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। সেচের কাজে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের সময়মতো সেচ দিতে সমস্যা হতে পারে। একইভাবে দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র শিল্প ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইনভিত্তিক কাজ ও ডিজিটাল সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠছে। শিবালয়ের সমেজঘর-তেওতা এলাকায় এক গ্রাহকের স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ইউনিটের বিল আসার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মিটার পরীক্ষা, পূর্ববর্তী ব্যবহারের তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজন হলে বিল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগও রয়েছে। মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় ২০২৬ সালের মার্চে নতুন ৩৩ কেভি বে-ব্রেকার কমিশনিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানো, সিস্টেম লস কমানো এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন অবকাঠামো ও ফিডার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের সুফল ভবিষ্যতে শিবালয়ের গ্রাহকেরা আরও বেশি পাবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীভাঙনের কারণে বিদ্যুতের খুঁটি, লাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিবালয়ের নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিবালয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইন সংস্কার, অতিরিক্ত লোডে থাকা ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ফিডারভিত্তিক লোড ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য গ্রাহক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় পর্যায়ের সেবাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা দরকার।
বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্ভাবনা থাকলে গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
শিবালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও সাম্প্রতিক দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রাটের ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ নয়, সরবরাহের মান ও ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা জরুরি। কোন এলাকায় কতবার বিভ্রাট হচ্ছে, কোথায় ভোল্টেজের সমস্যা বেশি এবং কোন ফিডার বা ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শিবালয়ের মানুষ এখন শুধু ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ চান না; তারা চান নিরবচ্ছিন্ন, স্থিতিশীল ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা। কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

শিবালয়ের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সেবা এখনো স্বপ্ন

আপডেট সময় : ১২:৩৭:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তার ঘটলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, লোডশেডিং এবং কিছু এলাকায় ভোল্টেজ সমস্যায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়।
শিবালয় উপজেলার সাত ইউনিয়ন—মহাদেবপুর, শিবালয়, উলাইল, উথলী, শিমুলিয়া, আরুয়া ও তেওতা—এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উপকেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ের অফিস রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজও চলছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবার প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে এর বড় উদাহরণ দেখা যায় ২২ আগস্ট। ওইদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় শিবালয়ের প্রায় অর্ধলক্ষ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরাও সমস্যায় পড়েন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। কারণ রোগীর ওয়ার্ড, আলো, ফ্যান, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। সেচের কাজে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের সময়মতো সেচ দিতে সমস্যা হতে পারে। একইভাবে দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র শিল্প ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইনভিত্তিক কাজ ও ডিজিটাল সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠছে। শিবালয়ের সমেজঘর-তেওতা এলাকায় এক গ্রাহকের স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ইউনিটের বিল আসার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মিটার পরীক্ষা, পূর্ববর্তী ব্যবহারের তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজন হলে বিল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগও রয়েছে। মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় ২০২৬ সালের মার্চে নতুন ৩৩ কেভি বে-ব্রেকার কমিশনিং করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানো, সিস্টেম লস কমানো এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন অবকাঠামো ও ফিডার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের সুফল ভবিষ্যতে শিবালয়ের গ্রাহকেরা আরও বেশি পাবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীভাঙনের কারণে বিদ্যুতের খুঁটি, লাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিবালয়ের নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিবালয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইন সংস্কার, অতিরিক্ত লোডে থাকা ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ফিডারভিত্তিক লোড ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য গ্রাহক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় পর্যায়ের সেবাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা দরকার।
বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্ভাবনা থাকলে গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
শিবালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও সাম্প্রতিক দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রাটের ঘটনা দেখিয়েছে, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ নয়, সরবরাহের মান ও ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা জরুরি। কোন এলাকায় কতবার বিভ্রাট হচ্ছে, কোথায় ভোল্টেজের সমস্যা বেশি এবং কোন ফিডার বা ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শিবালয়ের মানুষ এখন শুধু ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ চান না; তারা চান নিরবচ্ছিন্ন, স্থিতিশীল ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা। কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।