ঢাকা ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানা দুলাল চৌধুরী বাড়ি বর্তমানে জিন্ন ছিন্ন হয়ে রয়েছে ।

 

লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়ার চালতাতুলি এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়িটি স্থানীয়ভাবে “রাখালিয়া দুলাল চৌধুরী বাড়ি” বা রায়পুরের চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত。 এটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এবং এই অঞ্চলের এক প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্যবাহী জমিদার বংশের সাক্ষী。
​নিচে বাড়িটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বিবরণ তুলে ধরা হলো:
​বাড়িটির প্রতিষ্ঠা ও স্থাপত্য
​প্রতিষ্ঠাতা: সোনাপুর গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার এবং ব্রিটিশ আমলের ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মরহুম অলি উল্যা চৌধুরী ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।
​নির্মাণশৈলী: মোগল স্থাপত্যকলার ছোঁয়া রয়েছে এই ভবনে। তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে দক্ষ রাজমিস্ত্রি এনে ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ইট তৈরি করা হয়েছিল স্থানীয়ভাবেই, তবে জানালার গ্রিল, নকশা, কাঠ এবং ছাদের লোহার মোটা বারগুলো বিশেষভাবে কলকাতা থেকে নদীপথে আনা হয়েছিল।
​আয়তন: মূল ভবনটি প্রায় ১৩ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত হলেও পুরো চৌধুরী বাড়ির সীমানা প্রায় ৩৫ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বাড়ির সামনে একটি বড় পুকুর, সবজি বাগান এবং নানা রকম ফল ও ফুলের গাছ রয়েছে।
​বংশানুক্রমিক ইতিহাস ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা
​এই চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত স্থানীয় শাসন ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন:
​জমিদার অলি উল্যা চৌধুরী: এই বাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্রিটিশ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান।
​তছলিম উদ্দিন চৌধুরী: অলি উল্যা চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে তছলিম উদ্দিন চৌধুরী বাড়ির মালিকানা পান এবং তিনিও ব্রিটিশ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন (মৃত্যু: ১৯৬৩ খ্রি.)।
​তহির উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী: তছলিম উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে, যিনি পরবর্তীতে পরপর দুবার সোনাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
​তায়েফ উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী: তহির উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই তায়েফ উদ্দিন ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ও বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
​তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরী: তায়েফ উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরীর ছেলে তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরী পরবর্তীতে এই বাড়ির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নামানুসারেই অনেকে একে ‘দুলাল চৌধুরী বাড়ি’ হিসেবে চিনে থাকেন। তিনি রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রায়পুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই বাড়ির প্রধান অভিভাবক ছিলেন।
​বর্তমান অবস্থা
​বর্তমানে তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরীর বংশধর সমাজসেবক আবু সাঈদ চৌধুরী শাকিল এই বাড়িটির দেখাশোনা করছেন, যদিও পরিবারের অন্য অনেক সদস্য কর্মসূত্রে ঢাকায় বা অন্যান্য স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
​উপযুক্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই ভবনটির একটি বড় অংশ এখন জীর্ণশীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের এই অনন্য নিদর্শনটি টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয়রা ও চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানা দুলাল চৌধুরী বাড়ি বর্তমানে জিন্ন ছিন্ন হয়ে রয়েছে ।

আপডেট সময় : ০৯:১৮:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

 

লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়ার চালতাতুলি এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক চৌধুরী বাড়িটি স্থানীয়ভাবে “রাখালিয়া দুলাল চৌধুরী বাড়ি” বা রায়পুরের চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত。 এটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এবং এই অঞ্চলের এক প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্যবাহী জমিদার বংশের সাক্ষী。
​নিচে বাড়িটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বিবরণ তুলে ধরা হলো:
​বাড়িটির প্রতিষ্ঠা ও স্থাপত্য
​প্রতিষ্ঠাতা: সোনাপুর গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার এবং ব্রিটিশ আমলের ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মরহুম অলি উল্যা চৌধুরী ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।
​নির্মাণশৈলী: মোগল স্থাপত্যকলার ছোঁয়া রয়েছে এই ভবনে। তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে দক্ষ রাজমিস্ত্রি এনে ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ইট তৈরি করা হয়েছিল স্থানীয়ভাবেই, তবে জানালার গ্রিল, নকশা, কাঠ এবং ছাদের লোহার মোটা বারগুলো বিশেষভাবে কলকাতা থেকে নদীপথে আনা হয়েছিল।
​আয়তন: মূল ভবনটি প্রায় ১৩ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত হলেও পুরো চৌধুরী বাড়ির সীমানা প্রায় ৩৫ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বাড়ির সামনে একটি বড় পুকুর, সবজি বাগান এবং নানা রকম ফল ও ফুলের গাছ রয়েছে।
​বংশানুক্রমিক ইতিহাস ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা
​এই চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত স্থানীয় শাসন ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন:
​জমিদার অলি উল্যা চৌধুরী: এই বাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্রিটিশ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান।
​তছলিম উদ্দিন চৌধুরী: অলি উল্যা চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে তছলিম উদ্দিন চৌধুরী বাড়ির মালিকানা পান এবং তিনিও ব্রিটিশ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন (মৃত্যু: ১৯৬৩ খ্রি.)।
​তহির উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী: তছলিম উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে, যিনি পরবর্তীতে পরপর দুবার সোনাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
​তায়েফ উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরী: তহির উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই তায়েফ উদ্দিন ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ও বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
​তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরী: তায়েফ উদ্দিন আহম্মেদ চৌধুরীর ছেলে তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরী পরবর্তীতে এই বাড়ির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নামানুসারেই অনেকে একে ‘দুলাল চৌধুরী বাড়ি’ হিসেবে চিনে থাকেন। তিনি রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রায়পুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই বাড়ির প্রধান অভিভাবক ছিলেন।
​বর্তমান অবস্থা
​বর্তমানে তোজাম্মেল হোসেন দুলাল চৌধুরীর বংশধর সমাজসেবক আবু সাঈদ চৌধুরী শাকিল এই বাড়িটির দেখাশোনা করছেন, যদিও পরিবারের অন্য অনেক সদস্য কর্মসূত্রে ঢাকায় বা অন্যান্য স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
​উপযুক্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই ভবনটির একটি বড় অংশ এখন জীর্ণশীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের এই অনন্য নিদর্শনটি টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয়রা ও চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন।