সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার ঐতিহাসিক কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত ইকো পার্কের একটি অংশ একসময় ছিল ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতায় মানুষ যেখানে যেতে চাইত না, সেই পরিত্যক্ত স্থানটিকেই নিজেদের শ্রম, মেধা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবারবান্ধব বিনোদন কেন্দ্রে রূপ দিয়েছেন দুই শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা। তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘জলধারা ক্যাফে’ এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদেরও অন্যতম আকর্ষণ।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের উদ্যোক্তা শেখ সানজিদুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। শেখ সানজিদুল হক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
পড়াশোনা শেষে শেখ সানজিদুল হক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। চাকরির সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ২০২৩ সালে একটি ইলেকট্রনিক্স ব্যবসা শুরু করলেও কিস্তি ও বাকিতে পণ্য বিক্রির কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। একপর্যায়ে ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বেকার হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে, আব্দুল্লাহ আল মামুনও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও স্থায়ীভাবে সফল হতে পারেননি। একই ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত অবস্থায় দুই বন্ধুর মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পাটকেলঘাটা ইকো পার্কে কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে তোলেন ‘জলধারা ক্যাফে’।
উদ্যোক্তারা জানান, যেখানে বর্তমানে ক্যাফেটি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আগে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো। নিজেদের উদ্যোগে পুরো এলাকাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাঁশ, কাঠসহ পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নান্দনিক এই ক্যাফে। বর্তমানে এটি ইকো পার্কের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে ক্যাফেটি। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে চা, দুধ চা, কফি, ফুচকা, চটপটি, মোমো, রুটি ও বিভিন্ন ধরনের হালকা খাবারের ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ভিড় করেন।
শুধু ব্যবসা নয়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দুইজন অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ক্যাফেটিতে পার্ট-টাইম কাজ করছেন। এতে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের খরচের একটি অংশ বহন করতে পারছেন।
উদ্যোক্তা শেখ সানজিদুল হক বলেন, “ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, কিন্তু সাহস হারাইনি। আমরা বিশ্বাস করি, চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়া উচিত। একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের নয়, অন্যেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন।”
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়; সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। যে জায়গাটি একসময় ময়লার ভাগাড় ছিল, সেটি আজ মানুষের আনন্দ ও বিনোদনের স্থান। ভবিষ্যতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের পাশে দাঁড়াতে চাই।”
স্থানীয়দের মতে, দুই শিক্ষিত যুবকের এই উদ্যোগ শুধু একটি ক্যাফে প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান ও স্থানীয় পর্যটন বিকাশের একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে প্রতিকূলতাকেও সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
ময়লার ভাগাড় থেকে বিনোদন কেন্দ্র: সাতক্ষীরার দুই শিক্ষিত যুবকের উদ্যোগে প্রাণ ফিরে পেল কপোতাক্ষের তীর
-
মেহেদী হাসান শিমুল: - আপডেট সময় : ০৯:৩৮:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
- 82
ময়লার ভাগাড় থেকে বিনোদন কেন্দ্র: সাতক্ষীরার দুই শিক্ষিত যুবকের উদ্যোগে প্রাণ ফিরে পেল কপোতাক্ষের তীর
জনপ্রিয় সংবাদ



















