মাদারীপুরের একটি নীরব গ্রাম—নবগ্রাম ইউনিয়ন।
সবকিছু যেন আগের মতোই আছে, কিন্তু বাতাসে আজ এক অদ্ভুত ভার। কারণ, এখানে জন্ম নিয়েছে এমন এক গল্প—যেখানে ভালোবাসা আছে, ত্যাগ আছে, আবার আছে প্রশ্নবিদ্ধ মানবিকতা।
দশ বছরের সম্পর্ক।
একজন মানুষ তার যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়, ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর সঞ্চিত অর্থ—সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছে প্রিয় মানুষটির স্বপ্ন পূরণে। বিশ্বজিৎ শুধু একজন প্রেমিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নিরব যোদ্ধা—যিনি নিজের চাওয়া-পাওয়া ভুলে অন্যের স্বপ্নকে নিজের করে নিয়েছিলেন।
অনুশীলার স্বপ্ন ছিল—একদিন তিনি নার্স হবেন।
সেই স্বপ্ন পূরণের প্রতিটি ধাপে পাশে ছিলেন বিশ্বজিৎ। সমাজের কথা, পরিবারের চাপ—সবকিছু উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে গেছেন। লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন, কষ্টকে সঙ্গী করেছেন, তবুও থেমে যাননি।
চার বছর আগে তারা কোর্ট ম্যারেজ করেন।
ঢাকা শহরের এক ছোট্ট বাসায় শুরু হয় তাদের সংসার—স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে, সীমিত আয় কিন্তু অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা নিয়ে।
কিন্তু সময় বড়ই নিষ্ঠুর।
যেদিন অনুশীলা তার কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেলেন, সেদিন হয়তো তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। কিন্তু একই সাথে, বিশ্বজিতের জীবনে নেমে এলো এক অদৃশ্য দূরত্ব।
ধীরে ধীরে বদলে গেল সম্পর্কের উষ্ণতা, কমে গেল কথা, নিভে গেল চোখের ভাষা।
অবশেষে—
এক টুকরো কাগজে লেখা হলো “ডিভোর্স”।
আজ সেই মানুষটি, যিনি একদিন ভালোবাসার জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন, তিনি বসে আছেন তারই প্রিয় মানুষের বাড়ির সামনে—অনশনে।
তার চোখের জল কেউ দেখে না, তার নীরব কান্না কেউ শোনে না।
এ যেন এক জীবন্ত প্রশ্ন—মানবিকতার কাছে, ভালোবাসার কাছে।
এই গল্পের অন্য দিকও আছে।
অনুশীলা দাবি করেছেন, তাকে জোর করে বিয়ে করানো হয়েছিল।
সত্য-মিথ্যা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
যদি সবই জোর হয়, তবে সেই দীর্ঘ সহবাস, সেই একসাথে কাটানো বছরগুলো—সেগুলোর ব্যাখ্যা কী?
আমরা খুব সহজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই।
কেউ বলে—“মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করানো ঠিক না।”
আবার কেউ বলে—“পুরুষরা সুযোগ নেয়।”
কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক জটিল।
শিক্ষা কাউকে নিষ্ঠুর করে না,
আর ভালোবাসা কাউকে ছোট করে না।
কিন্তু যখন বিশ্বাস ভেঙে যায়—তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের ভেতরের মানবিকতার।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়, এটি দায়িত্ব, সম্মান এবং সততার এক পবিত্র বন্ধন।
একজনের ত্যাগ যদি অন্যজনের কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়, তবে সেই সম্পর্ক আর সম্পর্ক থাকে না—তা হয়ে যায় এক বেদনাবিধুর ইতিহাস।
আজ বিশ্বজিৎ শুধু স্বীকৃতি চাইছেন না—
তিনি খুঁজছেন তার ভালোবাসার মর্যাদা, তার ত্যাগের ন্যায্য মূল্য।
আর আমরা?
আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে থাকবো?
নাকি অন্তত একবার নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করবো—
“ভালোবাসার ঋণ—এভাবেই কি শোধ হয়?”
ভালোবাসার ঋণ—এভাবেই কি শোধ হয়?
-
প্রতিনিধি দৈনিক বাংলা সংবাদ এম আলী হোসাইন - আপডেট সময় : ০৪:১৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
- 87
জনপ্রিয় সংবাদ




















