ভোলার দৌলতখান উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন চর মদনপুরের অসহায় ও ভূমিহীন প্রতিবন্ধী মানুষের আশ্রয়ের শেষ সম্বল কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী সিরাজ কসাইয়ের বিরুদ্ধে। চরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক প্রতিবন্ধী দম্পতির সরকারি ঘরের বারান্দা ও চালা ভেঙে সেখানে জোরপূর্বক দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে ওই প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী পরিবারটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, চর মদনপুরের ১ নম্বর চর বৈরাগী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে আতঙ্কের অপর নাম এই সিরাজ কসাই। তার নিজস্ব বাহিনীর ভয়ে চরের নিরীহ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না। ভূমিহীন প্রতিবন্ধী সেলিম ও তার স্ত্রী ফেরদৌস দম্পতির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছিল সরকারি এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটি। মেঘনার ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী সেলিমের ঘরের বারান্দা ও চালা ভেঙে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে সিরাজ কসাই তার দোকানঘরটি নির্মাণ করেছে। অশ্রুসিক্ত চোখে প্রতিবন্ধী সেলিম বলেন,আমি অসহায়, হাঁটতেও পারি না। মেঘনার ভাঙনে আমরা নিঃস্ব। সরকার দয়া করে একটা প্রতিবন্ধী কার্ড আর এই ঘরখানা দিছিল। ওরা ঘরডা বন্ধ করে দোকান উঠাইছে, আমাদের কিছু করার নাই। আমরা ওদের কাছে জিম্মি। আপনারা (সাংবাদিকরা) চলে গেলে ওরা আমাদের মারবে, চরে আমাদের রক্ষা করার কেউ নাই। সরকারের দেওয়া চালের কার্ডটাও কখন কেড়ে নেয়, সেই ভয়ে আছি।”সেলিমের স্ত্রী ফেরদৌস জানান, সরকার তাদের পুনর্বাসনের জন্য একটি গরু ও একটি ছাগলও দিয়েছিল। তিনি বলেন, “এখন ঘর বন্ধ করে দেওয়ায় গরু-ছাগল নিয়ে কোথায় থাকব? ওরা অনেক পয়সাওয়ালা আর ক্ষমতাবান। আমরা এখন ভয়ে দিন কাটাচ্ছি। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছি জানতে পারলে আমাদের চর থেকে তাড়িয়ে দেবে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাধিক বাসিন্দা জানান, চরের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন চকেটের নাম ভাঙিয়ে সিরাজ কসাই ও তার দলবল চরের অসহায় মানুষের ওপর জুলুম চালায়। তারা জামাল উদ্দিনের কান ভারী করে রাখায় ভুক্তভোগীরা সেখানে গিয়েও কোনো বিচার পান না। চরের বাসিন্দা রশিদ বেপারী বলেন, “প্রতিবন্ধী সেলিম খুবই অসহায়। আমি নিজে মাঝে মাঝে ওদের চাল কিনে দিই। ওদের ঘরটা এভাবে বন্ধ করে দোকান দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি।”অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সিরাজ কসাই বলেন,আমি জামাল মিয়ার আদেশে ঘরের চালা সরিয়ে দোকান তুলেছি। এই দোকানের ভিটি তার ফুফাতো ভাই এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হায়দার আলী লেলিনের ড্রাইভারের। এখানে কাপড়ের দোকান হবে। জামাল মিয়া বলেছেন এখানকার আরও ঘর সরিয়ে তিনি মার্কেট করবেন।” সরকারি জায়গায় কীভাবে মার্কেট করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জায়গা সরকারের তাতে কী হয়েছে? মিয়া ভাই স্কুল করছে, এহন মার্কেটও করবে।”তবে এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হায়দার আলী লেলিন। তিনি বলেন, “মদনপুর চর নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। আমার কোনো ব্যক্তিগত ড্রাইভারও নেই। যে বা যারা আমার নাম ব্যবহার করে চরে অপরাধ করছে, তাদের ধরে নিয়ে আসুন। অপরাধীর কোনো ছাড় নেই।” এদিকে চরের বর্তমান প্রধান জামাল উদ্দিন চকেট বলেন, “বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দখল ও প্রতিবন্ধী পরিবারকে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে দৌলতখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মতিন খান বলেন, “সরকারি ঘর ভেঙে দোকান নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিবন্ধী সেলিমের পরিবারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিবন্ধীর সরকারি ঘর ভেঙে দোকান বানালেন ‘সিরাজ কসাই’, চরম আতঙ্কে অসহায় পরিবার
-
মোঃ সবুজ ভোলা জেলা প্রতিনিধি। - আপডেট সময় : ০৮:১৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
- 75
জনপ্রিয় সংবাদ




















