ঢাকা ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নোটিশের পরও ভাঙা হয়নি জরাজীর্ণ ভবন, একাংশ ধসে আতঙ্কে ভৈরব বাজার: অল্পের জন্য রক্ষা পেল বহু মানুষের প্রাণ

কিশোরগঞ্জ জেলার বন্দরনগরী ভৈরবের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র চকবাজারে একটি জরাজীর্ণ বহুতল ভবনের একাংশ ধসে পড়ে অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো গেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ছিল মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে ফিরে আসার এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এই এলাকায় সামান্য সময়ের ব্যবধানে ঘটে যেতে পারত ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আজ
রোববার (১২ জুলাই) ভৈরব বাজার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় মানুষের চলাচল ছিলো না। ভৈরব বাজারের চকবাজারে আম্মাজান হোটেলের সামনে জগন্নাথপুর এলাকার দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ভবনের একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধসের শব্দে আশপাশের ব্যবসায়ী, পথচারী ও ক্রেতারা ছুটোছুটি শুরু করেন। সৌভাগ্যবশত ধসের সময় ভবনের নিচে কোনো ব্যক্তি অবস্থান না করায় বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। দেয়ালে বড় বড় ফাটল, খসে পড়া পলেস্তারা, বেরিয়ে থাকা রড এবং দুর্বল কাঠামো দেখে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, ভবনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ভৈরব পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ ভবন মালিককে লিখিত নোটিশ প্রদান করেছিলেন। নোটিশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও ভবন অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো নির্দেশনা কার্যকর হলে আজকের এই ধসের ঘটনা ঘটে”জরাজীর্ণ বহুতল ভবনের ঝুঁকিতে বন্দরনগরী ভৈরব: যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ভৈরব বাজার, শাহী মসজিদ এলাকা, রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ফেরীঘাট এবং মেঘনা নদীর তীরবর্তী বহু পুরাতন ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় আজকের এই ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বছরের পর বছর কাঠামোগত পরীক্ষা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বহু পুরাতন ভবনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনগুলোর দেয়ালে ফাটল, বেরিয়ে আসা রড, ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়া এবং খসে পড়া পলেস্তারা যেন সম্ভাব্য বিপর্যয়ের নীরব পূর্বাভাস বহন করছে।
ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক হাজী আশরাফুল আলম রুজেন বলেন, “ভৈরব শুধু একটি উপজেলা শহর নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই বাজার ও আশপাশের এলাকায় চলাচল করেন। একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে পড়লে তার দায়ভার কে নেবে? দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চকবাজার, শাহী মসজিদ সংলগ্ন এলাকা এবং নদীতীরবর্তী অনেক পুরাতন ভবনে এখনও কারেন্ট জাল,রিংজাল,শর্ক মেশিনসহ অনেক বৈধ ও অবৈধ ভারী মালামাল সংরক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এতে ভবনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, স্ট্রাকচারাল অডিট, লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাটাগরিতে শ্রেণিবিন্যাস, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ব্যবহার বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সামান্য ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এসব ভবন ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী পৌর কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নোটিশ প্রদান, ভবন খালি করা, ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে সিলগালা করার ক্ষমতা রাখে। সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়—আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এ বিষয়ে ভৈরব পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী আরিফ সারোয়ার বাতেন বলেন, “ভৈরব বাজারে বেশ কয়েকটি পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের মালিকদের পৌরসভার পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
চকবাজারের এই ধস আবারও প্রমাণ করল—অবহেলায় ফেলে রাখা একটি জরাজীর্ণ ভবন কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, এটি মানুষের জীবনের ওপর ঝুলে থাকা একটি নীরব মৃত্যুফাঁদ। তাই আর কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে প্রশাসন, ভবন মালিক, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে দ্রুত, কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভৈরবের সর্বস্তরের মানুষ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

নোটিশের পরও ভাঙা হয়নি জরাজীর্ণ ভবন, একাংশ ধসে আতঙ্কে ভৈরব বাজার: অল্পের জন্য রক্ষা পেল বহু মানুষের প্রাণ

আপডেট সময় : ০৬:৩০:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

কিশোরগঞ্জ জেলার বন্দরনগরী ভৈরবের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র চকবাজারে একটি জরাজীর্ণ বহুতল ভবনের একাংশ ধসে পড়ে অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো গেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন ছিল মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে ফিরে আসার এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এই এলাকায় সামান্য সময়ের ব্যবধানে ঘটে যেতে পারত ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আজ
রোববার (১২ জুলাই) ভৈরব বাজার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় মানুষের চলাচল ছিলো না। ভৈরব বাজারের চকবাজারে আম্মাজান হোটেলের সামনে জগন্নাথপুর এলাকার দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ভবনের একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধসের শব্দে আশপাশের ব্যবসায়ী, পথচারী ও ক্রেতারা ছুটোছুটি শুরু করেন। সৌভাগ্যবশত ধসের সময় ভবনের নিচে কোনো ব্যক্তি অবস্থান না করায় বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। দেয়ালে বড় বড় ফাটল, খসে পড়া পলেস্তারা, বেরিয়ে থাকা রড এবং দুর্বল কাঠামো দেখে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, ভবনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ভৈরব পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ ভবন মালিককে লিখিত নোটিশ প্রদান করেছিলেন। নোটিশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও ভবন অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো নির্দেশনা কার্যকর হলে আজকের এই ধসের ঘটনা ঘটে”জরাজীর্ণ বহুতল ভবনের ঝুঁকিতে বন্দরনগরী ভৈরব: যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ভৈরব বাজার, শাহী মসজিদ এলাকা, রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ফেরীঘাট এবং মেঘনা নদীর তীরবর্তী বহু পুরাতন ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় আজকের এই ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বছরের পর বছর কাঠামোগত পরীক্ষা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বহু পুরাতন ভবনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনগুলোর দেয়ালে ফাটল, বেরিয়ে আসা রড, ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়া এবং খসে পড়া পলেস্তারা যেন সম্ভাব্য বিপর্যয়ের নীরব পূর্বাভাস বহন করছে।
ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক হাজী আশরাফুল আলম রুজেন বলেন, “ভৈরব শুধু একটি উপজেলা শহর নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই বাজার ও আশপাশের এলাকায় চলাচল করেন। একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে পড়লে তার দায়ভার কে নেবে? দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চকবাজার, শাহী মসজিদ সংলগ্ন এলাকা এবং নদীতীরবর্তী অনেক পুরাতন ভবনে এখনও কারেন্ট জাল,রিংজাল,শর্ক মেশিনসহ অনেক বৈধ ও অবৈধ ভারী মালামাল সংরক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এতে ভবনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, স্ট্রাকচারাল অডিট, লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাটাগরিতে শ্রেণিবিন্যাস, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ব্যবহার বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সামান্য ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এসব ভবন ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী পৌর কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নোটিশ প্রদান, ভবন খালি করা, ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে সিলগালা করার ক্ষমতা রাখে। সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়—আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এ বিষয়ে ভৈরব পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী আরিফ সারোয়ার বাতেন বলেন, “ভৈরব বাজারে বেশ কয়েকটি পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের মালিকদের পৌরসভার পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
চকবাজারের এই ধস আবারও প্রমাণ করল—অবহেলায় ফেলে রাখা একটি জরাজীর্ণ ভবন কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, এটি মানুষের জীবনের ওপর ঝুলে থাকা একটি নীরব মৃত্যুফাঁদ। তাই আর কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে প্রশাসন, ভবন মালিক, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে দ্রুত, কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভৈরবের সর্বস্তরের মানুষ।