হবিগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক ধুলিয়াখাল-মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়ক যেন দিন দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার এক ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ পথে পরিণত হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে এ সড়কে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে টমটম-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক বিপ্লব দেব (৩২) নিহত এবং বাস-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে আরও এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা সড়কটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রায়ই এ সড়কের বিভিন্ন অংশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তরুণ মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক।
সম্প্রতি খোয়াই নদীর কালীগঞ্জ এলাকায় ভাঙনের কারণে ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যান চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও সড়কের অংশ ভেঙে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে খানাখন্দ ও অসমতল পথ। এরই মধ্যে ওই এলাকায় টমটম ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে বিপ্লব দেবের মৃত্যুর ঘটনায় সড়কের বর্তমান বেহাল অবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সামনে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা, গর্ত ও ভাঙাচোরা অংশ অনেক সময় দূর থেকে সহজে বোঝা যায় না। বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় চালকদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। পাশাপাশি একই সড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেল, টমটমসহ ছোট যানবাহনের মিশ্র চলাচলও দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সড়ক ব্যবহারকারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পেছনে শুধু সড়কের বেহাল অবস্থাই দায়ী নয়; চালকদের অসচেতনতাও বড় কারণ। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং, বিপরীত লেনে প্রবেশ, ট্রাফিক আইন না মানা, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, অদক্ষ চালক এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। অনেক তরুণ চালক সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর সময় গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সড়কের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ডের অভাব, রোড মার্কিং না থাকা বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া এবং কিছু স্থানে সড়কের প্রস্থ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বাঁক ও সংকীর্ণ অংশগুলোতে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন অনেক সময় চালকের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকায় হঠাৎ মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সড়ক অবকাঠামো, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমেই ধুলিয়াখাল-মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে খোয়াই নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত, সড়কের গর্ত ও খানাখন্দ সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, গতিসীমা নির্দেশক, রোড মার্কিং ও প্রয়োজনীয় সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করা দরকার। রাতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বৈধ লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি ও অভিযান প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালক ও যাত্রীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদ, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দায়িত্বশীল ও নিরাপদ মোটরসাইকেল চালনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন।
ধুলিয়াখাল-মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কটি হবিগঞ্জের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের জন্যও সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে। ফলে এ সড়কে বারবার দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে তা শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের স্বাভাবিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনা ঘটার পর দায়ী ব্যক্তি খোঁজার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি জরুরি। কোন কোন স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে এবং কী ধরনের অবকাঠামোগত বা আইনগত ব্যবস্থা নিলে তা কমানো সম্ভব—এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ জোরদার করা হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধুলিয়াখাল-মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কে প্রাণহানির এই মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ধুলিয়াখাল-মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অশনিসংকেত একের পর এক প্রাণহানি, আতঙ্কে পথচারী-যাত্রী—দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
-
মোঃ সমুজ আলী রানা, বাহুবল (হবিগঞ্জ)প্রতিনিধি : - আপডেট সময় : ১০:০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
- 85
জনপ্রিয় সংবাদ




















