ঢাকা ০৭:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুধকুমারের ভয়াল গ্রাসে বিপর্যস্ত পাইকডাঙ্গা ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে মানুষ, ক্ষোভে ফুঁসে উঠে মানববন্ধনে

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা-র পাইকেরছড়া ইউনিয়ন-এর পাইকডাঙ্গা এলাকায় যেন নেমে এসেছে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ। ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে দুধকুমার নদী-র ভয়াল ভাঙন। প্রতিদিন নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা, বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা এবং বছরের পর বছর রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তোলা জীবনের শেষ সম্বল। চোখের সামনে সব হারিয়ে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে শত শত পরিবারে। অথচ এই ভয়াবহ দুর্যোগেও যেন নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ।
এই চরম দুর্দশা থেকে রক্ষা পেতে এবং অবিলম্বে নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে শনিবার দুপুরে দুধকুমার নদের তীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ। নদীভাঙনের শিকার প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উঠে আসে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা আর বাঁচার আকুতি। একটাই প্রশ্ন ছিল সবার কণ্ঠে— “আর কত ঘরবাড়ি নদীতে ভেসে গেলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে?”
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ-এর সভাপতি রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ-এর সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“শুধু দুধকুমার নদী নয়, কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর অন্তত ৩৬টি পয়েন্টে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। গত এক দশকে লক্ষাধিক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রের কাছে এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর কোনো সঠিক হিসাব নেই। নতুন করে যারা সর্বস্ব হারাচ্ছেন, তাদের খোঁজ নেওয়ারও যেন কেউ নেই।”
তিনি আরও বলেন,
“বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো বছরের পর বছর অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।”
চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,
“পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, তেমনি দেশের কোটি কোটি চরাঞ্চলের মানুষের টেকসই উন্নয়ন, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করা সময়ের দাবি।”
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক আশরাফুল হক রুবেল, আব্দুল আখের, হুমায়ুন কবির, ইসমাইল হোসেন ইউসুফ, ইয়াসিন আলী, সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস চঞ্চল, জাহাঙ্গীর আলম হ্যাপি, ৪নং ওয়ার্ডের পাইকেরছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
বক্তারা অবিলম্বে পাইকডাঙ্গা এলাকায় দুধকুমার নদের ভয়াবহ ভাঙন রোধে স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
আজ দুধকুমারের ভাঙনে শুধু মাটি হারাচ্ছে না পাইকডাঙ্গা— হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। নদীর গর্জনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অসহায় মানুষের কান্না। এখন পুরো এলাকার মানুষের একটাই আর্তনাদ
“আর কত সর্বনাশ দেখলে দায়িত্বশীলদের বিবেক জাগবে?”

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

দুধকুমারের ভয়াল গ্রাসে বিপর্যস্ত পাইকডাঙ্গা ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে মানুষ, ক্ষোভে ফুঁসে উঠে মানববন্ধনে

আপডেট সময় : ১০:৫১:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা-র পাইকেরছড়া ইউনিয়ন-এর পাইকডাঙ্গা এলাকায় যেন নেমে এসেছে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ। ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে দুধকুমার নদী-র ভয়াল ভাঙন। প্রতিদিন নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা, বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা এবং বছরের পর বছর রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তোলা জীবনের শেষ সম্বল। চোখের সামনে সব হারিয়ে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে শত শত পরিবারে। অথচ এই ভয়াবহ দুর্যোগেও যেন নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ।
এই চরম দুর্দশা থেকে রক্ষা পেতে এবং অবিলম্বে নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে শনিবার দুপুরে দুধকুমার নদের তীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ। নদীভাঙনের শিকার প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উঠে আসে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা আর বাঁচার আকুতি। একটাই প্রশ্ন ছিল সবার কণ্ঠে— “আর কত ঘরবাড়ি নদীতে ভেসে গেলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে?”
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ-এর সভাপতি রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ-এর সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“শুধু দুধকুমার নদী নয়, কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর অন্তত ৩৬টি পয়েন্টে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। গত এক দশকে লক্ষাধিক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রের কাছে এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর কোনো সঠিক হিসাব নেই। নতুন করে যারা সর্বস্ব হারাচ্ছেন, তাদের খোঁজ নেওয়ারও যেন কেউ নেই।”
তিনি আরও বলেন,
“বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো বছরের পর বছর অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।”
চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,
“পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, তেমনি দেশের কোটি কোটি চরাঞ্চলের মানুষের টেকসই উন্নয়ন, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করা সময়ের দাবি।”
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক আশরাফুল হক রুবেল, আব্দুল আখের, হুমায়ুন কবির, ইসমাইল হোসেন ইউসুফ, ইয়াসিন আলী, সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস চঞ্চল, জাহাঙ্গীর আলম হ্যাপি, ৪নং ওয়ার্ডের পাইকেরছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
বক্তারা অবিলম্বে পাইকডাঙ্গা এলাকায় দুধকুমার নদের ভয়াবহ ভাঙন রোধে স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
আজ দুধকুমারের ভাঙনে শুধু মাটি হারাচ্ছে না পাইকডাঙ্গা— হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। নদীর গর্জনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অসহায় মানুষের কান্না। এখন পুরো এলাকার মানুষের একটাই আর্তনাদ
“আর কত সর্বনাশ দেখলে দায়িত্বশীলদের বিবেক জাগবে?”