অনুমোদন ছাড়াই বিপুল সার বিক্রির অভিযোগে তোলপাড়—গুদামের হিসাব, রেজিস্টার ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে পুলিশ
দিনাজপুর প্রতিনিধি: কৃষকের জন্য সংরক্ষিত সরকারি সার কি গোপনে চলে গেছে খোলাবাজারে? দিনাজপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একটি সরকারি সারগুদাম থেকে অনুমোদন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রায় ৩২৭ মেট্রিক টন সার বিক্রির অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গুদামের দায়িত্বে থাকা স্টোরকিপার মো. আকতারুল ইসলাম (৩৫)-কে আটক করেছে পুলিশ। তবে তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত বিপুল পরিমাণ সার কীভাবে সরকারি গুদাম থেকে বের হলো, কার কাছে বিক্রি হলো এবং এর আর্থিক লেনদেনের অর্থ কোথায় গেছে?
সোমবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় অভিযোগের ভিত্তিতে দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর এলাকায় অবস্থিত বিএডিসির সরকারি সারগুদামে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় গুদামের দায়িত্বে থাকা স্টোরকিপার মো. আকতারুল ইসলামকে আটক করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে সরকারি নিয়ম ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিপুল পরিমাণ সার গুদাম থেকে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, সরকারি সার গ্রহণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আটক স্টোরকিপারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সার বিক্রির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তবে তদন্তের স্বার্থে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। বিশেষ করে—
৩২৭ মেট্রিক টন সার প্রকৃতপক্ষে কোথায় এবং কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে?
গুদাম থেকে সার বের করার সময় কোন কোন নথি ব্যবহার করা হয়েছে?
মজুত রেজিস্টার ও বাস্তব মজুতের মধ্যে কোনো গরমিল রয়েছে কি না?
বিক্রির অর্থ কার কাছে গেছে?
এই ঘটনায় শুধু স্টোরকিপার নাকি গুদাম ব্যবস্থাপনার অন্য কেউও জড়িত?
কোনো সার ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী বা সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন গুদামের মজুত হিসাব, সার গ্রহণ ও বিতরণের রেজিস্টার, চালানপত্র, অনুমোদন সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
কৃষকের সার কোথায় গেল—উঠছে বড় প্রশ্ন
সরকারি সার ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হলো কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়া। কৃষি মৌসুমে সার সরবরাহে অনিয়ম হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দাম বৃদ্ধি এবং কৃষকদের ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারি গুদাম থেকে এত বিপুল পরিমাণ সার বের হয়ে থাকলে বিষয়টি কি শুধু একজন কর্মচারীর মাধ্যমে সম্ভব, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো সিন্ডিকেট বা প্রভাবশালী চক্র কাজ করেছে?
তাদের দাবি, ঘটনার তদন্ত শুধু একজন স্টোরকিপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গুদামের পুরো ব্যবস্থাপনা, সার পরিবহন, বিতরণ, মজুত হিসাব এবং আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং কৃষকের অধিকার ও দেশের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুতর বিষয়।
তদন্তে জড়িতদের খোঁজে অভিযান
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে। গুদামের নথিপত্র ও হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী, সার ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সরকারি সার ব্যবস্থাপনায় এমন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত করে প্রকৃত সার বিক্রির পরিমাণ, আর্থিক লেনদেন এবং জড়িতদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নথিপত্র যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে সরকারি সার বিক্রির পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। তখনই জানা যাবে—৩২৭ মেট্রিক টন সার বিক্রির অভিযোগের পেছনে কেবল একজন কর্মচারী, নাকি আরও বড় কোনো চক্র সক্রিয় ছিল।
দিনাজপুরে সরকারি সারগুদাম থেকে ৩২৭ টন সার বিক্রির অভিযোগ, স্টোরকিপার আটক
-
মোঃ মশিউর ইসলাম - আপডেট সময় : ০১:২৩:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- 38
জনপ্রিয় সংবাদ




















