ঢাকা ০৫:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা বর্ষণে কুড়িগ্রামে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি,পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন

টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম যেন এক নীরব কৃষি বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। মাঠের পর মাঠ বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে ডুবছে কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম, আশা আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আকস্মিক এই দুর্যোগে জেলার সবকটি উপজেলায় কৃষকরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায়।
গত শনিবার দুপুর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। ভারি বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বোরো মৌসুমের চাষিরা। পাকা, অর্ধপাকা ও কাঁচা,সব ধরনের ধানই এখন পানির কবলে।
কৃষকরা জানান, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ধানের জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বৃষ্টির মধ্যেই পাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন, কিন্তু অর্ধপাকা ও কাঁচা ধান নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিচু জমির অধিকাংশ ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। এমনকি অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতেও পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
কৃষক লিয়াতক আলী বলেন, “ঘন বৃষ্টি আর হালকা বাতাসে আমার প্রায় এক বিঘা জমির কাঁচা ধান পানিতে পড়ে গেছে।”
অন্য কৃষক ইয়াকুব আলী জানান, “আমার ১৪ কাঠা জমির ধান পুরোটাই পানিতে নেতিয়ে পড়েছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।”
বোরো মৌসুমে ভালো ফলনের আশা নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু টানা বর্ষণ আর মৃদু বাতাসে জমির ধান পানিতে লুটিয়ে পড়ায় তাদের সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে।
উলিপুর উপজেলার চর বজরা এলাকার কৃষক আবদুস সামাদ (৭০) জানান, তার ছয় বিঘা জমির ধান ও ১০ বিঘা জমির ভুট্টা পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, “দ্রুত কাটতে না পারলে বড় ক্ষতি হবে। কিন্তু শ্রমিকের খরচ বেশি, আবার বৃষ্টি থাকলে কাটলেও শুকাতে পারব না কী করব বুঝতে পারছি না।”
ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষকরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, “ধান পেকে গেছে, কিন্তু রোদ না থাকায় কাটতে পারছি না। কাটলেও শুকাতে পারব না—সব দিক থেকেই আমরা বিপদে।”
এদিকে যারা আগেই ধান কেটেছেন, তারাও পড়েছেন নতুন দুশ্চিন্তায়। রোদের অভাবে ঘরে তোলা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বৃষ্টির পানিতে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।”
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা নদ ও ধরলা নদসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে নদীর চরাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের চোখে-মুখে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। দ্রুত আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে কুড়িগ্রামের কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সবজির দাম চড়া, অস্থির ডিমের বাজার

টানা বর্ষণে কুড়িগ্রামে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি,পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন

আপডেট সময় : ০৭:৫৯:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম যেন এক নীরব কৃষি বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। মাঠের পর মাঠ বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে ডুবছে কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম, আশা আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আকস্মিক এই দুর্যোগে জেলার সবকটি উপজেলায় কৃষকরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায়।
গত শনিবার দুপুর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। ভারি বর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বোরো মৌসুমের চাষিরা। পাকা, অর্ধপাকা ও কাঁচা,সব ধরনের ধানই এখন পানির কবলে।
কৃষকরা জানান, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ধানের জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বৃষ্টির মধ্যেই পাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন, কিন্তু অর্ধপাকা ও কাঁচা ধান নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিচু জমির অধিকাংশ ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। এমনকি অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতেও পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
কৃষক লিয়াতক আলী বলেন, “ঘন বৃষ্টি আর হালকা বাতাসে আমার প্রায় এক বিঘা জমির কাঁচা ধান পানিতে পড়ে গেছে।”
অন্য কৃষক ইয়াকুব আলী জানান, “আমার ১৪ কাঠা জমির ধান পুরোটাই পানিতে নেতিয়ে পড়েছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।”
বোরো মৌসুমে ভালো ফলনের আশা নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু টানা বর্ষণ আর মৃদু বাতাসে জমির ধান পানিতে লুটিয়ে পড়ায় তাদের সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে।
উলিপুর উপজেলার চর বজরা এলাকার কৃষক আবদুস সামাদ (৭০) জানান, তার ছয় বিঘা জমির ধান ও ১০ বিঘা জমির ভুট্টা পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, “দ্রুত কাটতে না পারলে বড় ক্ষতি হবে। কিন্তু শ্রমিকের খরচ বেশি, আবার বৃষ্টি থাকলে কাটলেও শুকাতে পারব না কী করব বুঝতে পারছি না।”
ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষকরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, “ধান পেকে গেছে, কিন্তু রোদ না থাকায় কাটতে পারছি না। কাটলেও শুকাতে পারব না—সব দিক থেকেই আমরা বিপদে।”
এদিকে যারা আগেই ধান কেটেছেন, তারাও পড়েছেন নতুন দুশ্চিন্তায়। রোদের অভাবে ঘরে তোলা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বৃষ্টির পানিতে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।”
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা নদ ও ধরলা নদসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে নদীর চরাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের চোখে-মুখে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। দ্রুত আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে কুড়িগ্রামের কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।