যার কাছে গুণগতমানের চিকিৎসা পেতে চেম্বারে নয়, যেতে হতো সরকারি হাসপাতালেই;নকলায় দরিদ্র মানুষের সেই আশার আলো, মানবিক চিকিৎসক ডা. নাইমা ইসলাম পিংকির বদলি
রাইসুল ইসলাম রিফাত, স্টাফ রিপোর্টার:
নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ও সহকারী সার্জন ডা. নাইমা ইসলাম পিংকির বদলির খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও আবেগের সৃষ্টি হয়েছে। একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে তিনি যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার জন্যও অর্জন করেছিলেন অনন্য সম্মান।
বিশেষ করে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আশার আলো। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, দুশ্চিন্তা ও কষ্টকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ কিংবা বহির্বিভাগে তার কাছে আসা রোগীরা পেতেন আন্তরিকতা, সময়োপযোগী পরামর্শ এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা।
বর্তমান সময়ে যখন অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক মনোভাবের অভিযোগ শোনা যায়, সেখানে ডা. নাইমা ইসলাম পিংকি ছিলেন ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ। তিনি নকলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাহিরে কোনো ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা করতেন না এবং রোগী পাঠিয়ে কমিশন বা পার্সেন্টেজ নেওয়ার সংস্কৃতি থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলেন। চেম্বার নয়, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকেই সেবার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ডা. নাইমা ইসলাম পিংকি। ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা বা রোগী টানার কোনো প্রচেষ্টার পরিবর্তে তিনি হাসপাতালেই নিয়মিত ও গুণগতমানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। তার কাছে চিকিৎসা নিতে রোগীদের আলাদা কোনো চেম্বারে যেতে হতো না, হাসপাতালেই মিলত আন্তরিকতা, প্রয়োজনীয় সময় এবং মানসম্মত চিকিৎসা।
জানা যায়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর ৪২ তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান এর মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানেও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বদলি হয়ে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করার মধ্য দিয়ে অফিস ব্যবস্থাপনায় গ্রহণযোগ্যতা
পেয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে।
ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে রোগীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই মানবিক চিকিৎসক বিশেষ করে অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। সেবার প্রতি নিষ্ঠা, পেশাগত সততা এবং মানবিক মূল্যবোধের কারণে তিনি নকলা উপজেলার মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে তার দায়িত্ব পালনকালে হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় বলে অনেকেই মনে করেন। দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে তার কঠোর অবস্থান, কর্মকর্তা কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়।হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কোনো অসংগতি কিংবা দূর্নীতি পরিলক্ষিত হলে তাকে জানানো হলে দেখা মিলতো সমাধানের আলো।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের খাবারের মান বজায় রাখা, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবার মানোন্নয়ন এবং সামগ্রিক শৃঙ্খলা রক্ষায় তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। রোগী ও স্বজনদের অনেকেই মনে করেন, তার দায়িত্বকালীন সময়ে হাসপাতালের সেবার মান এবং কর্মপরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছিল।
জানা গেছে, ১৩ জুন, শনিবার নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা. নাইমা ইসলাম পিংকির শেষ কর্মদিবস ছিল। এ উপলক্ষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে তাকে বিদায়ী শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জানানো হয়।এসময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফাসহ মেডিকেল অফিসারবৃন্দ, নার্স এবং হাসপাতালের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সহকর্মীরা তার সততা, কর্মনিষ্ঠা, নেতৃত্বগুণ ও মানবিক আচরণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং নতুন কর্মস্থলে তার সফলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের মধ্যেই আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যা তার প্রতি সহকর্মীদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার বদলি হলেও নকলার মানুষের হৃদয়ে তিনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক চিকিৎসক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য নকলাবাসী শুভকামনা জানিয়েছেন এবং প্রত্যাশা করেছেন, তিনি যেখানেই দায়িত্ব পালন করুক না কেন, সেখানেও মানুষের কল্যাণে একই নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে যাবেন।
মোঃ গোলাম কুদ্দুস স্টাফ রিপোর্টার গফরগাঁও -ময়মনসিংহ 



















