ক্ষুধা লাগে, কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারেন না—‘আমাদের একটু খাবার দিন।’ কেউ খাবার হাতে তুলে দিলে খেয়ে নেন, না দিলে নীরবে অপেক্ষা করেন। তাদের জীবনের চাওয়া-পাওয়া বলতে শুধু দুমুঠো খাবার আর একটু মানবিক সহানুভূতি।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নের চাদকাঠী গ্রামের দাসনগর এলাকার তিন প্রতিবন্ধী ভাই রিপন দাস (৪৫), সাধন দাস (৩৮) ও নিদু দাসের জীবন এখন অসহায়ত্বের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। জন্ম থেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত এই তিন ভাইয়ের মধ্যে সাধন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং রিপন ও নিদু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। জীবনের কঠিন বাস্তবতা হয়তো তারা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন না, তবে মায়ের শূন্যতা ঠিকই অনুভব করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের সামনে মূল্যবান কোনো জিনিস রাখলেও তারা তাতে আগ্রহ দেখান না। নেই কোনো লোভ কিংবা বাড়তি চাওয়া। তাদের একমাত্র প্রয়োজন খাবার। অথচ সেই খাবারের জন্যও তারা কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। ক্ষুধা সহ্য করেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন।
একসময় বাবা রতন চন্দ্র দাস ও মা সরস্বতী রানীর স্নেহ-ভালোবাসায় কোনোভাবে চলছিল তাদের জীবন। গত বছর বাবা মারা গেলে অসুস্থ শরীর নিয়েও তিন ছেলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মা সরস্বতী রানী। দীর্ঘদিন লিভার ও কিডনি রোগে ভুগলেও সন্তানদের ছেড়ে যাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মেনে গত ১৯ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর যেন ভেঙে পড়ে তিন ভাইয়ের ছোট্ট পৃথিবী। স্থানীয়দের দাবি, প্রায়ই তাদের মায়ের কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। হয়তো তারা ভাষায় কিছু বলতে পারেন না, কিন্তু কবরের পাশে বসে মায়ের স্নেহ, মমতা আর নিরাপত্তার স্মৃতি খুঁজে ফেরেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড় বোন প্রায় ২০ বছর আগে ভারতে চলে গেছেন। আরেক ভাই গজন দাস আলাদা বসবাস করেন এবং খুব একটা খোঁজখবর নেন না। ছোট ভাই সুজন চন্দ্র দাস দিনমজুরের কাজ করে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। তার স্ত্রী আঁখি দাস আগে ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দেখাশোনার জন্য তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। তবে সীমিত আয়ে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব বহন করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবুও ভাইদের ছেড়ে যেতে চান না সুজন ও তার স্ত্রী আঁখি। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আঁখি দাস বলেন, ‘আমি কখনো তাদের ফেলে দিতে পারব না। আমার তিন সন্তানকে একমুঠো খাওয়াতে পারলে তাদেরও খাওয়াবো। যত কষ্টই হোক, ভাইদের ফেলে রাখব না। ভগবান যেন আমাকে সেই শক্তি দেন।’
এদিকে জরাজীর্ণ টিনের ঘরটিও এখন তাদের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। বর্ষার বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।
প্রতিবেশী সঞ্চিতা পাল বলেন, ‘ওদের কোনো বোধশক্তি নেই। পচা-বাসি খাবার দিলেও খেয়ে ফেলে। সারাদিন কাজ করতে বললে কাজ করে। শুধু একটু খাবারের আশায় সবকিছু করে দেয়। কিন্তু কখনো কারও কাছে টাকা, কাপড় বা অন্য কিছু চায় না। আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসে, কিন্তু কোনো জিনিসে হাত দেয় না।’
আরেক প্রতিবেশী অমিত দাস বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বরে তাদের বাবা মারা যান। এরপর থেকেই পরিবারটির জীবনে নেমে আসে দুর্দশা। অনেক সংগ্রাম করে সন্তানদের আগলে রেখেছিলেন মা সরস্বতী রানী। কিন্তু গত ১৯ মে তার মৃত্যুর পর তিন ভাই আরও অসহায় হয়ে পড়েছে। তাদের দেখলে বোঝা যায়, দারিদ্র্য কতটা নির্মম হতে পারে।’
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘তিন ভাইয়ের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তারা বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তাদের স্বাবলম্বী করতে গবাদিপশু প্রদান অথবা কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী তিন ভাইয়ের বিষয়টি আমি জেনেছি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার এক মাসের সম্মানীর অর্থ তাদের সহায়তায় দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাদের বসবাসের ঘর সংস্কার এবং নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বাউফল উপজেলা প্রতিনিধি : মোঃ আব্দুল্লাহ আল লিখন 



















