ঢাকা ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাজের শুরুতেই একগুচ্ছ উদ্যোগ, এবার ফল দেখানোর পালা—এম এ হান্নানকে ঘিরে নাসিরনগরের প্রত্যাশা কাজের শুরু, সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিনকে অনেকেই ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলেন। এই সময়ে জনগণ নতুন প্রতিনিধিকে সময় দেন, সুযোগ দেন। আর জনপ্রতিনিধির সামনে থাকে নিজেকে প্রমাণ করার প্রথম বড় পরীক্ষা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ নাসিরনগর আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের সেই ১৮০ দিনও শেষ হয়েছে। এখন তাই স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ—কী প্রতিশ্রুতি ছিল, কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কতটা কাজ এগিয়েছে এবং আগামী দিনে তাঁর সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই কিছু উদ্যোগ সামনে এসেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নাসিরনগর সরকারি কলেজে দুটি বিষয়ে অনার্স চালুর উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।
শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় নয়, তরুণ প্রজন্মকে গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নাসিরনগরের ৬০ জন শিক্ষার্থীকে জাতীয় সংসদে নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যৎ নাগরিকদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি দেখার সুযোগ করে দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি দিক।
নাসিরনগরের উন্নয়নের বড় প্রশ্ন যোগাযোগব্যবস্থা। রাস্তা ও ব্রিজের সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট কমাতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাজের মান, স্থায়িত্ব ও মানুষের বাস্তব দুর্ভোগ কতটা কমছে তার ওপর।
কৃষিনির্ভর নাসিরনগরের জন্য কৃষকের হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার পরিচয় দেয়। উৎপাদনের পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করার চাপ থেকে কৃষককে কিছুটা মুক্ত করার ক্ষেত্রে সংরক্ষণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকের আয় ও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন বাজার ইজারামুক্ত করার উদ্যোগ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বাজার ইজারামুক্ত হলে ব্যবসায়ীদের ওপর অযাচিত ব্যয় কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর।
নাসিরনগরের সামাজিক বাস্তবতায় মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান ও শ্মশান মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিরও বার্তা দেয়।
ন্যায়বিচার ও মানুষের পাশে থাকার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে—এমন মূল্যায়ন রয়েছে স্থানীয় মহলে। তবে একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দল, মত, পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করা। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই।
নাসিরনগরকে মাদকমুক্ত করা এবং দাঙ্গা-সহিংসতা প্রতিরোধও তাঁর সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো এলাকার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও প্রশাসনিক অবস্থান প্রয়োজন।
উপজেলার জেলে সমাজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। নাসিরনগরের জলাশয় ও হাওরনির্ভর এই জনগোষ্ঠীর জীবিকা নানা সংকটের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, আধুনিক মাছ ধরার উপকরণ, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ বাড়ানো গেলে জেলে পরিবারের জীবনমান বদলানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ নাসিরনগরের প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
একইভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগও নাসিরনগরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, সহজ ঋণ, হস্তশিল্প ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে নারীদের যুক্ত করা গেলে পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও তাঁদের অবদান বাড়বে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন মানে শুধু একটি পরিবারের আয় বাড়ানো নয়; এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা ও জীবনমানেও।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাসিরনগরের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলতে পারে। বর্তমান শ্রমবাজারে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিদ্যুৎ সমস্যা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের কারণ। আগামী দিনে এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এম এ হান্নানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে। বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন হলে কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র শিল্প—সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে উন্নয়নের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সরকারি অর্থে যে উন্নয়ন হয়, সেটি জনগণের অর্থ। তাই প্রতিটি রাস্তা, ব্রিজ, ভবন কিংবা প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নিতে পারলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।
একইভাবে সরকারি সেবাকে দালালমুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ যেন ভূমি, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি সহায়তা, বিভিন্ন সনদ কিংবা সরকারি সুবিধা পেতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে না হয়—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি সুবিধা ও ভাতা যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে দল-মত, পরিচয় বা প্রভাবের বাইরে থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পৌঁছে যায়, সেটিও জনপ্রতিনিধিত্বের বড় পরীক্ষা।
কারণ জনগণ শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা চায় ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা।
একজন কৃষক চান তাঁর প্রাপ্য সুবিধা তিনি পান। একজন জেলে চান তাঁর জীবিকা নিরাপদ হোক। একজন নারী চান নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ। একজন শিক্ষার্থী চান মানসম্মত শিক্ষা। একজন ব্যবসায়ী চান হয়রানিমুক্ত পরিবেশ। আর একজন সাধারণ নাগরিক চান সরকারি অফিসে গিয়ে কোনো দালাল ছাড়াই নিজের কাজটি করতে।
এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারলেই উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল বাস্তব অর্থে মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
সব মিলিয়ে এম এ হান্নানের প্রথম ১৮০ দিনকে এক কথায় সফল বা ব্যর্থ বলা এখনই সম্ভব নয়। তবে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপনা, সামাজিক অবকাঠামো, তরুণ ও নারীর উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে যে উদ্যোগগুলোর কথা সামনে এসেছে, সেগুলোকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখা যায়।
এখন সামনে আরও বড় পরীক্ষা—উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা।
রাস্তা হলে তা টেকসই করতে হবে। হিমাগারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার আলোচনা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিতে হবে। জেলে ও নারীদের জন্য পরিকল্পনাগুলো বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। মাদক ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আর উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সরকারি সেবা—সব জায়গায় নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা।
১৮০ দিনের পর জনগণ আর শুধু জানতে চাইবে না—‘কী ঘোষণা হয়েছে?’
তারা জানতে চাইবে—‘কাজ কতটা হয়েছে, আর আমাদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?’
এটাই হবে এম এ হান্নানের সামনে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ একজন সংসদ সদস্যের সাফল্য শুধু সংসদে বক্তব্য, সভা কিংবা প্রকল্প উদ্বোধনের সংখ্যায় মাপা যায় না। সাফল্য মাপা হয় একজন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সরকারি সেবা কতটা সহজ হয়েছে, উন্নয়নের অর্থ কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যয় হয়েছে এবং মানুষ তাঁর এলাকায় কতটা নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন—তার ওপর।
প্রথম ১৮০ দিনে কাজের একটি সূচনা দেখা গেছে। এখন সেই সূচনাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব উন্নয়নে রূপ দেওয়াই হবে এম এ হান্নানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
হানিমুন শেষ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

কাজের শুরুতেই একগুচ্ছ উদ্যোগ, এবার ফল দেখানোর পালা—এম এ হান্নানকে ঘিরে নাসিরনগরের প্রত্যাশা কাজের শুরু, সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৮:০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিনকে অনেকেই ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলেন। এই সময়ে জনগণ নতুন প্রতিনিধিকে সময় দেন, সুযোগ দেন। আর জনপ্রতিনিধির সামনে থাকে নিজেকে প্রমাণ করার প্রথম বড় পরীক্ষা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ নাসিরনগর আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের সেই ১৮০ দিনও শেষ হয়েছে। এখন তাই স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ—কী প্রতিশ্রুতি ছিল, কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কতটা কাজ এগিয়েছে এবং আগামী দিনে তাঁর সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই কিছু উদ্যোগ সামনে এসেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নাসিরনগর সরকারি কলেজে দুটি বিষয়ে অনার্স চালুর উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।
শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় নয়, তরুণ প্রজন্মকে গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নাসিরনগরের ৬০ জন শিক্ষার্থীকে জাতীয় সংসদে নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যৎ নাগরিকদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি দেখার সুযোগ করে দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি দিক।
নাসিরনগরের উন্নয়নের বড় প্রশ্ন যোগাযোগব্যবস্থা। রাস্তা ও ব্রিজের সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট কমাতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাজের মান, স্থায়িত্ব ও মানুষের বাস্তব দুর্ভোগ কতটা কমছে তার ওপর।
কৃষিনির্ভর নাসিরনগরের জন্য কৃষকের হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার পরিচয় দেয়। উৎপাদনের পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করার চাপ থেকে কৃষককে কিছুটা মুক্ত করার ক্ষেত্রে সংরক্ষণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকের আয় ও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন বাজার ইজারামুক্ত করার উদ্যোগ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বাজার ইজারামুক্ত হলে ব্যবসায়ীদের ওপর অযাচিত ব্যয় কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর।
নাসিরনগরের সামাজিক বাস্তবতায় মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান ও শ্মশান মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিরও বার্তা দেয়।
ন্যায়বিচার ও মানুষের পাশে থাকার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে—এমন মূল্যায়ন রয়েছে স্থানীয় মহলে। তবে একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দল, মত, পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করা। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই।
নাসিরনগরকে মাদকমুক্ত করা এবং দাঙ্গা-সহিংসতা প্রতিরোধও তাঁর সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো এলাকার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও প্রশাসনিক অবস্থান প্রয়োজন।
উপজেলার জেলে সমাজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। নাসিরনগরের জলাশয় ও হাওরনির্ভর এই জনগোষ্ঠীর জীবিকা নানা সংকটের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, আধুনিক মাছ ধরার উপকরণ, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ বাড়ানো গেলে জেলে পরিবারের জীবনমান বদলানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ নাসিরনগরের প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
একইভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগও নাসিরনগরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, সহজ ঋণ, হস্তশিল্প ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে নারীদের যুক্ত করা গেলে পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও তাঁদের অবদান বাড়বে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন মানে শুধু একটি পরিবারের আয় বাড়ানো নয়; এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা ও জীবনমানেও।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নাসিরনগরের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলতে পারে। বর্তমান শ্রমবাজারে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিদ্যুৎ সমস্যা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের কারণ। আগামী দিনে এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এম এ হান্নানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে। বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন হলে কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র শিল্প—সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে উন্নয়নের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সরকারি অর্থে যে উন্নয়ন হয়, সেটি জনগণের অর্থ। তাই প্রতিটি রাস্তা, ব্রিজ, ভবন কিংবা প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নিতে পারলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।
একইভাবে সরকারি সেবাকে দালালমুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ যেন ভূমি, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি সহায়তা, বিভিন্ন সনদ কিংবা সরকারি সুবিধা পেতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে না হয়—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি সুবিধা ও ভাতা যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে দল-মত, পরিচয় বা প্রভাবের বাইরে থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পৌঁছে যায়, সেটিও জনপ্রতিনিধিত্বের বড় পরীক্ষা।
কারণ জনগণ শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা চায় ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা।
একজন কৃষক চান তাঁর প্রাপ্য সুবিধা তিনি পান। একজন জেলে চান তাঁর জীবিকা নিরাপদ হোক। একজন নারী চান নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ। একজন শিক্ষার্থী চান মানসম্মত শিক্ষা। একজন ব্যবসায়ী চান হয়রানিমুক্ত পরিবেশ। আর একজন সাধারণ নাগরিক চান সরকারি অফিসে গিয়ে কোনো দালাল ছাড়াই নিজের কাজটি করতে।
এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারলেই উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল বাস্তব অর্থে মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
সব মিলিয়ে এম এ হান্নানের প্রথম ১৮০ দিনকে এক কথায় সফল বা ব্যর্থ বলা এখনই সম্ভব নয়। তবে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপনা, সামাজিক অবকাঠামো, তরুণ ও নারীর উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে যে উদ্যোগগুলোর কথা সামনে এসেছে, সেগুলোকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখা যায়।
এখন সামনে আরও বড় পরীক্ষা—উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা।
রাস্তা হলে তা টেকসই করতে হবে। হিমাগারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার আলোচনা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিতে হবে। জেলে ও নারীদের জন্য পরিকল্পনাগুলো বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। মাদক ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আর উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সরকারি সেবা—সব জায়গায় নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা।
১৮০ দিনের পর জনগণ আর শুধু জানতে চাইবে না—‘কী ঘোষণা হয়েছে?’
তারা জানতে চাইবে—‘কাজ কতটা হয়েছে, আর আমাদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?’
এটাই হবে এম এ হান্নানের সামনে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ একজন সংসদ সদস্যের সাফল্য শুধু সংসদে বক্তব্য, সভা কিংবা প্রকল্প উদ্বোধনের সংখ্যায় মাপা যায় না। সাফল্য মাপা হয় একজন সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সরকারি সেবা কতটা সহজ হয়েছে, উন্নয়নের অর্থ কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যয় হয়েছে এবং মানুষ তাঁর এলাকায় কতটা নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছেন—তার ওপর।
প্রথম ১৮০ দিনে কাজের একটি সূচনা দেখা গেছে। এখন সেই সূচনাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব উন্নয়নে রূপ দেওয়াই হবে এম এ হান্নানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
হানিমুন শেষ।