ঢাকা ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তাল নদী, ভাঙা নৌকা: বর্ষার দুর্যোগে স্বপ্ন ডুবছে টেকনাফের জেলেদের

 

​মাছ ধরেই যাদের সংসার চলে, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের উত্তাল নদী আর শ্রাবণের টানা বর্ষণ তাদের জীবনে বয়ে আনে চরম বিপর্যয়। বিশেষ করে টেকনাফের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে বাস করা প্রান্তিক জেলেদের জীবন চাকা এখন পুরোপুরি স্থবির। বৈরী আবহাওয়া আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে একের পর এক নৌকা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু কাঠ-লোহার নৌকাই ভাঙছে না, ভেঙে যাচ্ছে হাজারো মৎস্যজীবীর জীবিকার স্বপ্ন। আর এই চরম সংকটে পড়ে বোবা কান্নায় রূপ নিয়েছে টেকনাফের জেলেদের এক সময়ের প্রাণোচ্ছল ‘নৌকার গান’।
​স্তব্ধ নৌকার গান, বেহাল দশা জেলেপাড়ায়
​একসময় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ বা লম্বরী ঘাটের জেলেরা যখন দল বেঁধে সাগরে যেতেন, তখন তাদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতো ঐতিহ্যবাহী সারি গান আর নৌকার গান। ঢেউয়ের তালে তালে গাওয়া সেই গান জেলেদের ক্লান্তি দূর করত, জোগাতো বুকভরা সাহস। কিন্তু এবারের বর্ষার নির্মম দুর্যোগ সেই গানের সুর কেড়ে নিয়েছে।
​উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে নৌকা হারিয়ে এখন টেকনাফের জেলেপাড়াগুলোতে চলছে হাহাকার। ঝড়ে সাজানো সংসার যেমন তছনছ হয়েছে, তেমনি অভাব আর ঋণের তাড়নায় জেলেদের সেই চিরচেনা নৌকার গানগুলোও আজ বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। গুনগুন সুরের জায়গায় এখন সেখানে কেবলই দীর্ঘশ্বাস।
​বুকফাটা আর্তনাদ: ‘নৌকা নাই তো জীবনও নাই’
​সরেজমিনে টেকনাফের উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। অনেক জেলেই চড়া সুদে দাদন নিয়ে বা চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তৈরি করেছিলেন সাধের মাছ ধরার নৌকা। কিন্তু আকস্মিক ঝড়ে সেই নৌকা যখন সাগরের বুকে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন তাদের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
​স্থানীয় এক প্রবীণ জেলে চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
​”আমাদের জীবন তো পানির লগে বাঁধা। আগে জালের দড়ি টানতে টানতে গলা ছাইড়া গান গাইতাম। এখন নৌকাও নাই, পেটে ভাতও নাই, গান আমু কোত্থেইক্যা? এবারকার ঝড়ে আমার নৌকাখান এক্কেরে চুরমার হয়া গেছে। এখন ক্যামনে কিস্তি শোধ করমু আর ক্যামনে পোলাপানের মুখে অন্ন দিমু, হেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখতাছি।”
​দুর্যোগের বহুমাত্রিক আঘাত
​টেকনাফের মৎস্যজীবীদের বর্তমান সংকটগুলো হলো:
​পুঁজি ও নৌকার ক্ষতি: একটি বড় নৌকা ও জাল তৈরি করতে যে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ হয়, তা হারিয়ে জেলেরা পুরোপুরি নিঃস্ব।
​সংস্কৃতির বিলুপ্তি: চরম অভাব আর দুশ্চিন্তার কারণে টেকনাফের মাঝিমাল্লাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান ও সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে।
​ঋণের মহাজাল: মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা শোধ করতে না পেরে অনেকেই এলাকা ছাড়ার উপক্রম হয়েছেন।
​সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার আহ্বান
​স্থানীয় সচেতন মহল ও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দের মতে, টেকনাফের এই প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। কেবল জরুরি ত্রাণ বা চাল-ডাল বিতরণ নয়, বরং দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া নৌকাগুলো মেরামত বা নতুন করে জাল কেনার জন্য জেলেদের সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ অথবা বিশেষ সরকারি অনুদান দেওয়া প্রয়োজন।
​ভাঙা নৌকা আর ভেজা চোখে টেকনাফের জেলেরা এখন তাকিয়ে আছেন প্রকৃতির শান্ত হওয়ার অপেক্ষায়। তারা চান আবার সাগরের বুকে নৌকা ভাসাতে, আর তাদের সেই বেহাল হয়ে পড়া নৌকার গানগুলো যেন আবার ফিরে পায় পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

উত্তাল নদী, ভাঙা নৌকা: বর্ষার দুর্যোগে স্বপ্ন ডুবছে টেকনাফের জেলেদের

আপডেট সময় : ০৭:০৭:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

 

​মাছ ধরেই যাদের সংসার চলে, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের উত্তাল নদী আর শ্রাবণের টানা বর্ষণ তাদের জীবনে বয়ে আনে চরম বিপর্যয়। বিশেষ করে টেকনাফের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে বাস করা প্রান্তিক জেলেদের জীবন চাকা এখন পুরোপুরি স্থবির। বৈরী আবহাওয়া আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে একের পর এক নৌকা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু কাঠ-লোহার নৌকাই ভাঙছে না, ভেঙে যাচ্ছে হাজারো মৎস্যজীবীর জীবিকার স্বপ্ন। আর এই চরম সংকটে পড়ে বোবা কান্নায় রূপ নিয়েছে টেকনাফের জেলেদের এক সময়ের প্রাণোচ্ছল ‘নৌকার গান’।
​স্তব্ধ নৌকার গান, বেহাল দশা জেলেপাড়ায়
​একসময় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ বা লম্বরী ঘাটের জেলেরা যখন দল বেঁধে সাগরে যেতেন, তখন তাদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতো ঐতিহ্যবাহী সারি গান আর নৌকার গান। ঢেউয়ের তালে তালে গাওয়া সেই গান জেলেদের ক্লান্তি দূর করত, জোগাতো বুকভরা সাহস। কিন্তু এবারের বর্ষার নির্মম দুর্যোগ সেই গানের সুর কেড়ে নিয়েছে।
​উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে নৌকা হারিয়ে এখন টেকনাফের জেলেপাড়াগুলোতে চলছে হাহাকার। ঝড়ে সাজানো সংসার যেমন তছনছ হয়েছে, তেমনি অভাব আর ঋণের তাড়নায় জেলেদের সেই চিরচেনা নৌকার গানগুলোও আজ বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। গুনগুন সুরের জায়গায় এখন সেখানে কেবলই দীর্ঘশ্বাস।
​বুকফাটা আর্তনাদ: ‘নৌকা নাই তো জীবনও নাই’
​সরেজমিনে টেকনাফের উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। অনেক জেলেই চড়া সুদে দাদন নিয়ে বা চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তৈরি করেছিলেন সাধের মাছ ধরার নৌকা। কিন্তু আকস্মিক ঝড়ে সেই নৌকা যখন সাগরের বুকে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন তাদের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
​স্থানীয় এক প্রবীণ জেলে চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
​”আমাদের জীবন তো পানির লগে বাঁধা। আগে জালের দড়ি টানতে টানতে গলা ছাইড়া গান গাইতাম। এখন নৌকাও নাই, পেটে ভাতও নাই, গান আমু কোত্থেইক্যা? এবারকার ঝড়ে আমার নৌকাখান এক্কেরে চুরমার হয়া গেছে। এখন ক্যামনে কিস্তি শোধ করমু আর ক্যামনে পোলাপানের মুখে অন্ন দিমু, হেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখতাছি।”
​দুর্যোগের বহুমাত্রিক আঘাত
​টেকনাফের মৎস্যজীবীদের বর্তমান সংকটগুলো হলো:
​পুঁজি ও নৌকার ক্ষতি: একটি বড় নৌকা ও জাল তৈরি করতে যে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ হয়, তা হারিয়ে জেলেরা পুরোপুরি নিঃস্ব।
​সংস্কৃতির বিলুপ্তি: চরম অভাব আর দুশ্চিন্তার কারণে টেকনাফের মাঝিমাল্লাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান ও সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে।
​ঋণের মহাজাল: মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা শোধ করতে না পেরে অনেকেই এলাকা ছাড়ার উপক্রম হয়েছেন।
​সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার আহ্বান
​স্থানীয় সচেতন মহল ও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দের মতে, টেকনাফের এই প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। কেবল জরুরি ত্রাণ বা চাল-ডাল বিতরণ নয়, বরং দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া নৌকাগুলো মেরামত বা নতুন করে জাল কেনার জন্য জেলেদের সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ অথবা বিশেষ সরকারি অনুদান দেওয়া প্রয়োজন।
​ভাঙা নৌকা আর ভেজা চোখে টেকনাফের জেলেরা এখন তাকিয়ে আছেন প্রকৃতির শান্ত হওয়ার অপেক্ষায়। তারা চান আবার সাগরের বুকে নৌকা ভাসাতে, আর তাদের সেই বেহাল হয়ে পড়া নৌকার গানগুলো যেন আবার ফিরে পায় পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য।