ঢাকা ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ ১৬ই মে সেই ঐতিহাসিক বাংলার জমিদারি উচ্ছেদ দিবস”

 

পূর্ববাংলার কৃষক-মুক্তি ও ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের ইতিহাস।
-শেখ নজরুল

১৬ মে ঐতিহাসিক জমিদারি উচ্ছেদ দিবস । “বাংশাই স্কুল এন্ড কলেজ EX ছাত্রছাত্রী ফোরাম” ফেজবুক পেইজে থেকে সংকলিত হয়েছে। ১৯৫১ সালের ১৬ মে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার আইন পরিষদে বিল পাশ করে জমিদারি উচ্ছেদ করে । এর ফলে পূর্ববাংলার কৃষক ও সাধারণ জনগণ জমিদারদের জুলুম থেকে রক্ষা পায় ।

মুসলিম লীগ এর মাধ্যমে অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সামাজিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার সৌধকে চ্যালেঞ্জ করেছিল । দুশো বছরের জমিদারি অত্যাচারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিলোপ করে দিয়ে মুসলিম লীগ রীতিমতো একটি বিপ্লবী ঘটনা ঘটিয়ে দেয় ।
এত বড় একটি বিপ্লবী ঘটনা ঘটিয়ে দেয়ার পরও কংগ্রেসের হিন্দুরা,হিন্দু নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা এবং এদের দ্বারা মগজ ধোলাইকৃত এদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দল হিসাবে চিহ্নিত করেন ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক লেখালেখি ও গবেষণা হলেও একান্নর জমিদারি উচ্ছেদ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি।

সাতচল্লিশ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর মুসলিম লীগ জমিদারি প্রথার অবসান করার উদ্যোগ নেন । এই জমিদারি ছিল বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণদের শক্তির উৎস । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালি আর মোসাহেবি করা কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি প্রকল্পের এই ব্রাহ্মণরা পূর্ব বঙ্গের সাধারণ কৃষক মুসলমানদের উপর এক নজিরবিহীন কর্তৃত্ব ও মাতব্বরি চালাতেন । জমিদারি উচ্ছেদের কারণে ব্রাহ্মণদের জুলুম ও মাতব্বরির দিন শেষ হয়ে যায় ।
সেই জমিদারি হারানোর বেদনা ভোলা সহজ ছিল না । সেই শোক ভুলে এপারের ব্রাহ্মণরা সেদিন কমিউনিস্ট পার্টিকে আঁকড়ে ধরেন এবং বিভাগ-পূর্ব কালের মতোই প্রাণপণে ইসলাম আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে খাঁড়া হন । পরবর্তীকালে নানা রকম সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিতর দিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন এবং ইসলাম ও মুসলমান বিরোধিতাকেই প্রগতিশীলতা,অসাম্প্রদায়িকতা ও আধুনিকতা নামের এক বিকৃত বয়ান খাঁড়া করেন । এই বিকৃত বয়ানের রাজনীতিই এখন আমাদের রাজনীতির মাঠকে গরম করে রেখেছে ।
(সাম্প্রদায়িকতা -ফাহমিদ উর রহমান)

বাংলায় ব্রিটিশদের আগমনের ফলে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় । কলকাতার হিন্দু বেনিয়ারা নিজেদেরকে একটি সুবিধাজনক অবস্হানে আবিষ্কার করে ,যারা এক সময় ইংরেজ ব্যবসায়ীদের ব্যবস্হাপক ও গোমস্তা হিসেবে কর্মরত ছিল ।

এসকল গোমস্তাদের ভূমিকা শুধু দেশীয় ব্যবসায়ীদের ধ্বংস করেনি,সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহকে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দেয় । সেই সময় গ্রামবাংলায় ইংরেজদের ছত্রছায়ায় তৎকালীন হিন্দু গোমস্তারা ব্যপক দৌরাত্ম্য ও লুটপাট চালিয়েছেন ।

এ সম্পর্কে এক ইংরেজ অফিসার অভিমত দিয়েছেন,”কেবল মাত্র একটি গোষ্ঠীকে ইংরেজরা ও তাদের আইন কানুন রক্ষা করে চলে,আর সেটি হলো তাদেরই খাস গোমস্তা,তাদের লুটপাটের ফলে খোদ ভারতীয় উপমহাদেশের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে হুমকির সন্মুখীন”।
(মুসলিম স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম ইন বেঙ্গল-মুঈন উদ-দীন আহমদ খান,পৃষ্ঠা১৫-১৬)

ব্রিটিশদের সহযোগিতায় এই হিন্দু গোমস্তরাই জমিদার হিসেবে আবির্ভূত হয় । যদিও মুর্শিদ কুলি খানের শাসনামল থেকেই হিন্দুরা বাংলার অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করতে শুরু করেন ।

মুসলিম শাসনামলে গ্রামীণ সমাজে জমিদারদের সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো এবং তাদের এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সেই ডাকাতদের এবং লুন্ঠিনকৃত জিনিষপত্র জনসম্মুখে হাজির করতে জমিদারগণ বাধ্য থাকতেন ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি১৭৯২ সালে এই ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে দেয় । সরকারের এই নতুন নীতির সুবিধা নিয়ে নব্য জমিদারগণ ডাকাতের ঘাঁটি গেঁড়ে বসে । লুটপাটের মালামাল ভাগ বাটোয়ারার বিনিময়ে এসব সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতো এইসব নব্য জমিদাররা ।১৯৪৪ সালের ক্যালকাটা রিভিউয়ে প্রকাশিত হওয়া এক নথিতে আয়ের উৎস হিসেবে জমিদারদের বিরুদ্ধে ডাকাতদের নিয়োজিত করার প্রমান উঠে আসে ।
এছাড়াও ১৭৯৩ সালে ঘোষিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাবে রাইয়তরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ।১৮৩০ সালে বুকানন সাহেবের বর্ণনায় জানা যায়,অত্যাচারী জমিদারেরা খাজনা আদায়ের জন্য তাদের প্রজাদেরকে শারীরিক নির্যাতন এমনকি বন্দী পর্যন্ত করে রাখতো ।

সূত্র:মুসলিম স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম ইন বেঙ্গল-ডক্টর অধ্যাপক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান । পৃষ্ঠা১৭,১৮,১৯

১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের সময় বাংলাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয়। এর ফলে এদেশে ইংরেজের অনুগত একদল জমিদার সৃষ্টি হলো ।

জমিদাররা সর্বাত্মকভাবে শোষণ-জুলুম চালিয়ে কৃষকদের সর্বস্ব কেড়ে নেয় ।১৮৪২ সালে বাংলাদেশে কোনো ভূমিহীন কৃষক ছিল না । কিন্তু১৯৩১ সালের আদমশুমারি থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের ভূমিহীন কৃষকদের সংখ্যা শতকরা ৩০ জন ।
এটা ছিল নিষ্ঠুর জমিদার ও প্রতারক মহাজনদের শোষণের পরিনাম ।
(চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালি সমাজ -মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত)
জমিদারদের বাড়িতে অন্ধকুপ ছিল । খাজনা পরিশোধ না করে জমিদারদের বিরোধিতা করলে অন্ধকুপে তাদের জীবন্ত নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো ।

জমিদারদের গোমস্তাদের বিরুদ্ধে প্রজারা আদালতে নালিশ করলে তা পঞ্চম আইনে দণ্ডনীয় বলে গণ্য হতো ।
সাতচল্লিশের চৌদ্দ আগষ্ট ছিলো উপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়ার মধ্যে দিয়ে পূর্ব বঙ্গের জমিদারি উচ্ছেদের মাধ্যমে এদেশের কৃষক মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ ।
এদেশের কমিউনিস্টরা জমিদারি উচ্ছেদ চাননি,তারা বরং তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে জমিদারি টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলো । তেভাগা আন্দোলন ছিলো জমিদারি বহাল রেখে ভাগাভাগির আন্দোলন!!

বাংলাদেশের ইতিহাসের এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯০৫ সালে যে হিন্দু নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সারা বাংলায় বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ১৯৪৭ সালে এসে তাঁরাই হলেন বাংলা বিভাগের অনমনীয় প্রবক্তা। অন্যদিকে ১৯০৫ সালে যে মুসলমান নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের কারণে খুশি হয়েছিলেন, তাঁরা ১৯৪৭ সালে ছিলেন বাংলাদেশ বিভাগের বিরুদ্ধে। এর পেছনে যে মনস্তত্ব কাজ করেছিল, সেটিই এদেশের ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

১৯৫১ সালের ১৬ মে মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার আইন সভায় বিল এনে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করেন ।

ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমউদ্দীন ১৯৩৪ সালে প্রথম কৃষকদের উপকারের জন্য ও জমিদারি অত্যাচারকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য বঙ্গীয় আইন সভায় ঋণসালিশী বিল উত্থাপন করান।পরে এই বিলের সূত্র ধরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঋণসালিশী বোর্ড প্রতিষ্টা করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে খাজা নাজিমউদ্দীন জমিদারি উচ্ছেদ বিল সংসদে উত্থাপন করেন। পরে এই বিলটি ১৯৫০ সালে নুরুল আমীনের মুসলিম লীগ সরকার সংসদে পাশ করান
১৯৫১ সালে খাজা নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসাবে স্বাক্ষরের পর বিলটি আইনে পরিণত হয়।

বাঙালি মুসলমানের এতো বড়ো উপকার করার পরও এদেশের প্রগতিশীল শ্রেণী খাজা নাজিমউদ্দীনকে বাঙালির শত্রু হিসাবে বলতে চান।কারণ তিনি ছিলেন উর্দুভাষী।অন্য দিকে এদেশের প্রগতিশীল শ্রেণীর দেবতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছেন।
প্রমথ চৌধুরীর লেখা রায়তের কথা বইয়ের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, জমিদারি ওঠে গেলে রায়তরা লাঠালাঠি করে মরবে।জমিদারির পক্ষে রবীন্দ্রনাথের এই যুক্তি অদ্ভুত নয় কি?
ইতিহাসের বিচারে তা হলে কে বেশি প্রগতিশীল -রবীন্দ্রনাথ না খাজা নাজিমউদ্দীন? এবার পাঠকরাই বিচার করুন।

বাংলার ইতিহাসে জমিদারি প্রথা ছিল উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি, যার মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র ভূস্বামী শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে কৃষকসমাজের উপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং এর ফলে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক গভীর বৈষম্যমূলক ক্ষমতা-কাঠামো গড়ে ওঠে। জমিদারদের খাজনা আদায়, শোষণ ও নিপীড়নের ভার বহন করতে গিয়ে সাধারণ কৃষক, বিশেষত পূর্ববাংলার দরিদ্র মুসলমান কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী, দীর্ঘকাল অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫১ সালের ১৬ মে পূর্ববাংলায় জমিদারি উচ্ছেদ আইন কার্যকর হওয়া ছিল একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা। এটি কেবল একটি ভূমি-সংস্কার কর্মসূচি ছিল না; বরং উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহীত এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জমিদারি উচ্ছেদের মাধ্যমে কৃষকসমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত দীর্ঘদিনের প্রভুত্বের অবসান ঘটে এবং পূর্ববাংলার সামাজিক বাস্তবতায় নতুন এক পরিবর্তনের সূচনা হয়।
তবে ইতিহাসচর্চায় এই ঘটনাটির গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন কিংবা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নানা অধ্যায় নিয়ে বিস্তর গবেষণা হলেও কৃষকসমাজের মুক্তি ও ভূমি-সম্পর্কের রূপান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায়শই আড়ালে থেকে গেছে। ফলে জমিদারি উচ্ছেদ দিবস কেবল একটি আইনি সংস্কারের স্মারক নয়; এটি বাংলার সামাজিক ইতিহাস, কৃষক-রাজনীতি এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

আজ ১৬ই মে সেই ঐতিহাসিক বাংলার জমিদারি উচ্ছেদ দিবস”

আপডেট সময় : ০২:৩১:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

 

পূর্ববাংলার কৃষক-মুক্তি ও ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের ইতিহাস।
-শেখ নজরুল

১৬ মে ঐতিহাসিক জমিদারি উচ্ছেদ দিবস । “বাংশাই স্কুল এন্ড কলেজ EX ছাত্রছাত্রী ফোরাম” ফেজবুক পেইজে থেকে সংকলিত হয়েছে। ১৯৫১ সালের ১৬ মে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার আইন পরিষদে বিল পাশ করে জমিদারি উচ্ছেদ করে । এর ফলে পূর্ববাংলার কৃষক ও সাধারণ জনগণ জমিদারদের জুলুম থেকে রক্ষা পায় ।

মুসলিম লীগ এর মাধ্যমে অত্যাচারী হিন্দু জমিদারদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সামাজিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার সৌধকে চ্যালেঞ্জ করেছিল । দুশো বছরের জমিদারি অত্যাচারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিলোপ করে দিয়ে মুসলিম লীগ রীতিমতো একটি বিপ্লবী ঘটনা ঘটিয়ে দেয় ।
এত বড় একটি বিপ্লবী ঘটনা ঘটিয়ে দেয়ার পরও কংগ্রেসের হিন্দুরা,হিন্দু নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা এবং এদের দ্বারা মগজ ধোলাইকৃত এদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল দল হিসাবে চিহ্নিত করেন ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক লেখালেখি ও গবেষণা হলেও একান্নর জমিদারি উচ্ছেদ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি।

সাতচল্লিশ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর মুসলিম লীগ জমিদারি প্রথার অবসান করার উদ্যোগ নেন । এই জমিদারি ছিল বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণদের শক্তির উৎস । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালি আর মোসাহেবি করা কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি প্রকল্পের এই ব্রাহ্মণরা পূর্ব বঙ্গের সাধারণ কৃষক মুসলমানদের উপর এক নজিরবিহীন কর্তৃত্ব ও মাতব্বরি চালাতেন । জমিদারি উচ্ছেদের কারণে ব্রাহ্মণদের জুলুম ও মাতব্বরির দিন শেষ হয়ে যায় ।
সেই জমিদারি হারানোর বেদনা ভোলা সহজ ছিল না । সেই শোক ভুলে এপারের ব্রাহ্মণরা সেদিন কমিউনিস্ট পার্টিকে আঁকড়ে ধরেন এবং বিভাগ-পূর্ব কালের মতোই প্রাণপণে ইসলাম আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে খাঁড়া হন । পরবর্তীকালে নানা রকম সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিতর দিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন এবং ইসলাম ও মুসলমান বিরোধিতাকেই প্রগতিশীলতা,অসাম্প্রদায়িকতা ও আধুনিকতা নামের এক বিকৃত বয়ান খাঁড়া করেন । এই বিকৃত বয়ানের রাজনীতিই এখন আমাদের রাজনীতির মাঠকে গরম করে রেখেছে ।
(সাম্প্রদায়িকতা -ফাহমিদ উর রহমান)

বাংলায় ব্রিটিশদের আগমনের ফলে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় । কলকাতার হিন্দু বেনিয়ারা নিজেদেরকে একটি সুবিধাজনক অবস্হানে আবিষ্কার করে ,যারা এক সময় ইংরেজ ব্যবসায়ীদের ব্যবস্হাপক ও গোমস্তা হিসেবে কর্মরত ছিল ।

এসকল গোমস্তাদের ভূমিকা শুধু দেশীয় ব্যবসায়ীদের ধ্বংস করেনি,সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহকে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দেয় । সেই সময় গ্রামবাংলায় ইংরেজদের ছত্রছায়ায় তৎকালীন হিন্দু গোমস্তারা ব্যপক দৌরাত্ম্য ও লুটপাট চালিয়েছেন ।

এ সম্পর্কে এক ইংরেজ অফিসার অভিমত দিয়েছেন,”কেবল মাত্র একটি গোষ্ঠীকে ইংরেজরা ও তাদের আইন কানুন রক্ষা করে চলে,আর সেটি হলো তাদেরই খাস গোমস্তা,তাদের লুটপাটের ফলে খোদ ভারতীয় উপমহাদেশের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে হুমকির সন্মুখীন”।
(মুসলিম স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম ইন বেঙ্গল-মুঈন উদ-দীন আহমদ খান,পৃষ্ঠা১৫-১৬)

ব্রিটিশদের সহযোগিতায় এই হিন্দু গোমস্তরাই জমিদার হিসেবে আবির্ভূত হয় । যদিও মুর্শিদ কুলি খানের শাসনামল থেকেই হিন্দুরা বাংলার অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করতে শুরু করেন ।

মুসলিম শাসনামলে গ্রামীণ সমাজে জমিদারদের সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো এবং তাদের এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সেই ডাকাতদের এবং লুন্ঠিনকৃত জিনিষপত্র জনসম্মুখে হাজির করতে জমিদারগণ বাধ্য থাকতেন ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি১৭৯২ সালে এই ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে দেয় । সরকারের এই নতুন নীতির সুবিধা নিয়ে নব্য জমিদারগণ ডাকাতের ঘাঁটি গেঁড়ে বসে । লুটপাটের মালামাল ভাগ বাটোয়ারার বিনিময়ে এসব সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতো এইসব নব্য জমিদাররা ।১৯৪৪ সালের ক্যালকাটা রিভিউয়ে প্রকাশিত হওয়া এক নথিতে আয়ের উৎস হিসেবে জমিদারদের বিরুদ্ধে ডাকাতদের নিয়োজিত করার প্রমান উঠে আসে ।
এছাড়াও ১৭৯৩ সালে ঘোষিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাবে রাইয়তরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ।১৮৩০ সালে বুকানন সাহেবের বর্ণনায় জানা যায়,অত্যাচারী জমিদারেরা খাজনা আদায়ের জন্য তাদের প্রজাদেরকে শারীরিক নির্যাতন এমনকি বন্দী পর্যন্ত করে রাখতো ।

সূত্র:মুসলিম স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম ইন বেঙ্গল-ডক্টর অধ্যাপক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান । পৃষ্ঠা১৭,১৮,১৯

১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের সময় বাংলাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয়। এর ফলে এদেশে ইংরেজের অনুগত একদল জমিদার সৃষ্টি হলো ।

জমিদাররা সর্বাত্মকভাবে শোষণ-জুলুম চালিয়ে কৃষকদের সর্বস্ব কেড়ে নেয় ।১৮৪২ সালে বাংলাদেশে কোনো ভূমিহীন কৃষক ছিল না । কিন্তু১৯৩১ সালের আদমশুমারি থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের ভূমিহীন কৃষকদের সংখ্যা শতকরা ৩০ জন ।
এটা ছিল নিষ্ঠুর জমিদার ও প্রতারক মহাজনদের শোষণের পরিনাম ।
(চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালি সমাজ -মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত)
জমিদারদের বাড়িতে অন্ধকুপ ছিল । খাজনা পরিশোধ না করে জমিদারদের বিরোধিতা করলে অন্ধকুপে তাদের জীবন্ত নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো ।

জমিদারদের গোমস্তাদের বিরুদ্ধে প্রজারা আদালতে নালিশ করলে তা পঞ্চম আইনে দণ্ডনীয় বলে গণ্য হতো ।
সাতচল্লিশের চৌদ্দ আগষ্ট ছিলো উপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়ার মধ্যে দিয়ে পূর্ব বঙ্গের জমিদারি উচ্ছেদের মাধ্যমে এদেশের কৃষক মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ ।
এদেশের কমিউনিস্টরা জমিদারি উচ্ছেদ চাননি,তারা বরং তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে জমিদারি টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলো । তেভাগা আন্দোলন ছিলো জমিদারি বহাল রেখে ভাগাভাগির আন্দোলন!!

বাংলাদেশের ইতিহাসের এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯০৫ সালে যে হিন্দু নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সারা বাংলায় বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ১৯৪৭ সালে এসে তাঁরাই হলেন বাংলা বিভাগের অনমনীয় প্রবক্তা। অন্যদিকে ১৯০৫ সালে যে মুসলমান নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের কারণে খুশি হয়েছিলেন, তাঁরা ১৯৪৭ সালে ছিলেন বাংলাদেশ বিভাগের বিরুদ্ধে। এর পেছনে যে মনস্তত্ব কাজ করেছিল, সেটিই এদেশের ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

১৯৫১ সালের ১৬ মে মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার আইন সভায় বিল এনে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করেন ।

ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমউদ্দীন ১৯৩৪ সালে প্রথম কৃষকদের উপকারের জন্য ও জমিদারি অত্যাচারকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য বঙ্গীয় আইন সভায় ঋণসালিশী বিল উত্থাপন করান।পরে এই বিলের সূত্র ধরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঋণসালিশী বোর্ড প্রতিষ্টা করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে খাজা নাজিমউদ্দীন জমিদারি উচ্ছেদ বিল সংসদে উত্থাপন করেন। পরে এই বিলটি ১৯৫০ সালে নুরুল আমীনের মুসলিম লীগ সরকার সংসদে পাশ করান
১৯৫১ সালে খাজা নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসাবে স্বাক্ষরের পর বিলটি আইনে পরিণত হয়।

বাঙালি মুসলমানের এতো বড়ো উপকার করার পরও এদেশের প্রগতিশীল শ্রেণী খাজা নাজিমউদ্দীনকে বাঙালির শত্রু হিসাবে বলতে চান।কারণ তিনি ছিলেন উর্দুভাষী।অন্য দিকে এদেশের প্রগতিশীল শ্রেণীর দেবতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু জমিদারি উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছেন।
প্রমথ চৌধুরীর লেখা রায়তের কথা বইয়ের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, জমিদারি ওঠে গেলে রায়তরা লাঠালাঠি করে মরবে।জমিদারির পক্ষে রবীন্দ্রনাথের এই যুক্তি অদ্ভুত নয় কি?
ইতিহাসের বিচারে তা হলে কে বেশি প্রগতিশীল -রবীন্দ্রনাথ না খাজা নাজিমউদ্দীন? এবার পাঠকরাই বিচার করুন।

বাংলার ইতিহাসে জমিদারি প্রথা ছিল উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি, যার মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র ভূস্বামী শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে কৃষকসমাজের উপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং এর ফলে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক গভীর বৈষম্যমূলক ক্ষমতা-কাঠামো গড়ে ওঠে। জমিদারদের খাজনা আদায়, শোষণ ও নিপীড়নের ভার বহন করতে গিয়ে সাধারণ কৃষক, বিশেষত পূর্ববাংলার দরিদ্র মুসলমান কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী, দীর্ঘকাল অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫১ সালের ১৬ মে পূর্ববাংলায় জমিদারি উচ্ছেদ আইন কার্যকর হওয়া ছিল একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা। এটি কেবল একটি ভূমি-সংস্কার কর্মসূচি ছিল না; বরং উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহীত এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জমিদারি উচ্ছেদের মাধ্যমে কৃষকসমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত দীর্ঘদিনের প্রভুত্বের অবসান ঘটে এবং পূর্ববাংলার সামাজিক বাস্তবতায় নতুন এক পরিবর্তনের সূচনা হয়।
তবে ইতিহাসচর্চায় এই ঘটনাটির গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন কিংবা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নানা অধ্যায় নিয়ে বিস্তর গবেষণা হলেও কৃষকসমাজের মুক্তি ও ভূমি-সম্পর্কের রূপান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায়শই আড়ালে থেকে গেছে। ফলে জমিদারি উচ্ছেদ দিবস কেবল একটি আইনি সংস্কারের স্মারক নয়; এটি বাংলার সামাজিক ইতিহাস, কৃষক-রাজনীতি এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।