১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ; সংস্কারকাজের অগ্রগতি, ব্যয় ও সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন
দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ২ নম্বর ইউনিটটি দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে উৎপাদনের বাইরে থাকা ইউনিটটি এখনো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে ফিরতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা এই ইউনিট পুনরায় সচল করতে বড় ধরনের ওভারহোলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংস্কার ও ওভারহোলিং কাজে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
দেশের উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পার্বতীপুর উপজেলার বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকার পাশে অবস্থিত। কেন্দ্রটির উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রের একটি বড় ইউনিট দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরেই অব্যবহৃত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ শুধু ২ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটির সম্ভাব্য ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় অচল অবস্থায় থাকায় ইউনিটটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, যান্ত্রিক সরঞ্জাম ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সাধারণ মেরামত নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং
কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট শুধু সাধারণ মেরামতের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা সব সময় সম্ভব হয় না। দীর্ঘ সময় অচল থাকলে বয়লার, টারবাইন, জেনারেটরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের কারিগরি অবস্থা পরীক্ষা করতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বা মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা এবং নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য বড় ধরনের ওভারহোলিং প্রয়োজন হয়।
ওভারহোলিং প্রক্রিয়ার আওতায় সাধারণত ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি খুলে বিস্তারিত পরীক্ষা, ত্রুটিপূর্ণ অংশ চিহ্নিতকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামত বা প্রতিস্থাপন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সংস্কার এবং কাজ শেষে পরীক্ষামূলকভাবে ইউনিট চালানোর কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে। সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই একটি ইউনিটকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়।
ব্যয় হতে পারে প্রায় ২০০ কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২ নম্বর ইউনিটকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ওভারহোলিং ও সংস্কারকাজে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তবে এই ব্যয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থের উৎস, চুক্তির মূল্য এবং কাজের পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বিবরণী সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ২ নম্বর ইউনিটটি পুনরায় চালু করতে বড় ধরনের ওভারহোলিং প্রয়োজন হবে। সে সময় তিনি এ কাজের জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছিল বলেও জানিয়েছিলেন।
সর্বশেষ কাজের অগ্রগতি জানতে সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ওরা কাজ করছে। কাজ অনেক দূর অগ্রসরও হয়েছে, হলেই জানতে পারবেন।”
তবে কাজটি কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে, চুক্তির মোট মূল্য কত, কত দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কবে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়েছে—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব এবং উৎপাদনে ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
২০২০ সালের নভেম্বর থেকে অচল
জানা গেছে, যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ২০২০ সালের নভেম্বরে ২ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও ইউনিটটি আর স্বাভাবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বড় উৎপাদন ইউনিট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষতি নয়, ইউনিটের যন্ত্রপাতির সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পুনঃচালুর ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিশেষ করে পুরোনো যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পুনরায় উৎপাদনে নেওয়ার আগে ব্যাপক কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই জরুরি হয়ে পড়ে।
স্বচ্ছতা ও সময়সীমা প্রকাশের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল, সাংবাদিক ও বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ে পরিচালিত হতে যাওয়া এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
তাদের দাবি, ওভারহোলিংয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছে, চুক্তির মূল্য কত, কী কী যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হবে, অর্থ বরাদ্দ কোথা থেকে আসছে, কাজের অগ্রগতি কত শতাংশ এবং কবে নাগাদ ২ নম্বর ইউনিটটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
তাদের মতে, জনস্বার্থে প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হলে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জবাবদিহিও বাড়বে।
উৎপাদনে ফিরলে বাড়বে সক্ষমতা
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ১২৫ মেগাওয়াটের ২ নম্বর ইউনিটটি সফলভাবে সংস্কার ও পুনরায় চালু করা গেলে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা ইউনিটটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন সময়সীমা ও কাজের গুণগত মান। কারণ দীর্ঘদিন অচল থাকা একটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট দ্রুত চালু করার পাশাপাশি সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য ও টেকসইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিটের ওভারহোলিং এখন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদেরও আগ্রহের কেন্দ্রে। প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনার মধ্যে দীর্ঘদিন অচল থাকা ১২৫ মেগাওয়াটের এই ইউনিট কবে পুরোপুরি সংস্কার শেষে জাতীয় গ্রিডে ফিরবে—এ প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাই।
বড়পুকুরিয়ার ২ নম্বর ইউনিট ৬ বছর ধরে বন্ধ, ওভারহোলিংয়ে ব্যয় হতে পারে ২০০ কোটি টাকা
-
মোঃ মশিউর ইসলাম - আপডেট সময় : ০১:৫৩:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- 32
জনপ্রিয় সংবাদ




















