ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদ্যুৎ আসে এই যায়, ১০ মিনিটও থাকে না, ব্যবসায় লালবাতি’

 

কুড়িগ্রামে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন-রাতে নির্দিষ্ট কোনো শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা। এতে একদিকে গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গৃহস্থালি কাজেও ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম শহর ও বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ আসার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন।

কুড়িগ্রাম শহরের দাদামোড়ের ব্যবসায়ী ইউনুস বলেন, ‘সিরিয়াল ছাড়া লোডশেডিং। এই কারেন্ট আসে, এই যায়। ১০ মিনিটও থাকে না। মাঝে মাঝে টানা দুই ঘণ্টাও লোডশেডিং চলে। দোকানে কাজ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলবে।’

সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের গৃহবধূ মোহতারিমা বলেন, গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই এখন রাইসকুকার ও ইন্ডাকশন কুকারে রান্না করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ভাত উঠায় দিলে ভাত আধা হওয়া হতেই কারেন্ট চলে যায়। খুব সমস্যায় পড়ছি। সারা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কারেন্ট থাকে।’

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের রসূলপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক মিজানুর রহমান বলেন, ‘গরমে মরে গেলাম ভাই। দিনে তো কারেন্ট থাকে না, রাতেও নাই। শনিবার আসরের আগে গেছে, রাত ৮টা পার হলেও আসেনি। অন্ধকারে বসে আছি। গ্রামের বাড়িতে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনাও করতে পারছে না। এভাবে চলা যায় না।’

এদিকে কোনো ধরনের নির্দিষ্ট শিডিউল ছাড়াই বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। কুড়িগ্রাম জেলা শহরের বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মী জ্যোতি আহমেদ তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘কোনো নোটিশ ছাড়া, রুটিন ছাড়া যখন ইচ্ছা, যেমন ইচ্ছা নেসকোর লোডশেডিং অন্যায়, অনিয়ম, ঔদ্ধত্য ও গ্রাহকদের পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব প্রকাশ করে।’

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অর্ধেক
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে ৪১ থেকে ৪৯ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘাটতি পূরণে রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বরাদ্দ কম থাকায় একেকটি এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে এনএলডিসির স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে কোনো কোনো ফিডারে লোডশেডিং শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হলেও আবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম শহরে চাহিদা ১৩, সরবরাহ সাড়ে ৬ মেগাওয়াট
নেসকো কুড়িগ্রাম অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম শহরে নেসকোর আওতায় ৩২ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। বর্তমানে এসব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠছে। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ মেগাওয়াট।

ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে নেসকোকে। পাশাপাশি চলছে স্ক্যাডা অপারেশন। শনিবার সারাদিনে স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে ছয়বার বিদ্যুৎহীন ছিল কুড়িগ্রাম নেসকোর আওতাধীন এলাকা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে শত শত গ্রাহক নেসকো অফিসে ফোন করে ক্ষোভ জানিয়েছেন।

নেসকো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অর্ধেক, কখনও অর্ধেকেরও কম। ফলে লোডশেডিং চলছে। সঙ্গে স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে কোনো সময় নেসকোর আওতাধীন সব ফিডার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ছে। বরাদ্দ বাড়লে লোডশেডিং কমে যাবে।’

গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময়সূচি সম্পর্কে আগাম জানানো হবে। এতে অন্তত জরুরি কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন তারা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

বিদ্যুৎ আসে এই যায়, ১০ মিনিটও থাকে না, ব্যবসায় লালবাতি’

আপডেট সময় : ০২:৩৭:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

 

কুড়িগ্রামে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন-রাতে নির্দিষ্ট কোনো শিডিউল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা। এতে একদিকে গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গৃহস্থালি কাজেও ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম শহর ও বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ আসার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন।

কুড়িগ্রাম শহরের দাদামোড়ের ব্যবসায়ী ইউনুস বলেন, ‘সিরিয়াল ছাড়া লোডশেডিং। এই কারেন্ট আসে, এই যায়। ১০ মিনিটও থাকে না। মাঝে মাঝে টানা দুই ঘণ্টাও লোডশেডিং চলে। দোকানে কাজ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায় লালবাতি জ্বলবে।’

সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের গৃহবধূ মোহতারিমা বলেন, গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই এখন রাইসকুকার ও ইন্ডাকশন কুকারে রান্না করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ভাত উঠায় দিলে ভাত আধা হওয়া হতেই কারেন্ট চলে যায়। খুব সমস্যায় পড়ছি। সারা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কারেন্ট থাকে।’

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের রসূলপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক মিজানুর রহমান বলেন, ‘গরমে মরে গেলাম ভাই। দিনে তো কারেন্ট থাকে না, রাতেও নাই। শনিবার আসরের আগে গেছে, রাত ৮টা পার হলেও আসেনি। অন্ধকারে বসে আছি। গ্রামের বাড়িতে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনাও করতে পারছে না। এভাবে চলা যায় না।’

এদিকে কোনো ধরনের নির্দিষ্ট শিডিউল ছাড়াই বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। কুড়িগ্রাম জেলা শহরের বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মী জ্যোতি আহমেদ তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘কোনো নোটিশ ছাড়া, রুটিন ছাড়া যখন ইচ্ছা, যেমন ইচ্ছা নেসকোর লোডশেডিং অন্যায়, অনিয়ম, ঔদ্ধত্য ও গ্রাহকদের পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব প্রকাশ করে।’

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অর্ধেক
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে ৪১ থেকে ৪৯ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘাটতি পূরণে রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বরাদ্দ কম থাকায় একেকটি এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে এনএলডিসির স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে কোনো কোনো ফিডারে লোডশেডিং শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হলেও আবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম শহরে চাহিদা ১৩, সরবরাহ সাড়ে ৬ মেগাওয়াট
নেসকো কুড়িগ্রাম অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম শহরে নেসকোর আওতায় ৩২ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। বর্তমানে এসব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠছে। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ মেগাওয়াট।

ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে নেসকোকে। পাশাপাশি চলছে স্ক্যাডা অপারেশন। শনিবার সারাদিনে স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে ছয়বার বিদ্যুৎহীন ছিল কুড়িগ্রাম নেসকোর আওতাধীন এলাকা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে শত শত গ্রাহক নেসকো অফিসে ফোন করে ক্ষোভ জানিয়েছেন।

নেসকো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অর্ধেক, কখনও অর্ধেকেরও কম। ফলে লোডশেডিং চলছে। সঙ্গে স্ক্যাডা অপারেশনের কারণে কোনো সময় নেসকোর আওতাধীন সব ফিডার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ছে। বরাদ্দ বাড়লে লোডশেডিং কমে যাবে।’

গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময়সূচি সম্পর্কে আগাম জানানো হবে। এতে অন্তত জরুরি কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন তারা।