সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতি এবং মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পিরোজপুরের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রব ও তাঁর স্ত্রী নাছরিন আক্তারের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে চলমান রয়েছে।
দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানের নথিমতে, আসামি আব্দুর রব ওরফে মিন্টু মৃধা ও তাঁর স্ত্রী নাছরিন আক্তারের নামে মোট ২ কোটি ৯৫ লাখ ৯১ হাজার ৯০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে তাদের বৈধ আয়ের সমস্ত উৎস বাদ দিয়ে মোট ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার ৭০২ টাকা মূল্যের সম্পদই সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত। এই বিপুল অর্থ আব্দুর রব সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে বিভিন্ন কর্মস্থলে থাকাকালীন ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একজন সাব-রেজিস্ট্রার মফস্বলে চাকরি করে এত টাকার মালিক কীভাবে হয়? তিনি কি আলাদিনের জাদুর চেরাগ পেয়েছেন যে হাত দিলেই কোটি কোটি টাকা বের হয়ে আসে? এগুলো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা টাকা।”
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভুক্তভোগীদের দাবি—মো. আবদুর রব ওরফে মিন্টু মৃধা আসলে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিপুল সম্পদের মালিক। মামলার এজাহারে উল্লেখিত সম্পদের বাইরেও তার আসল সম্পদের পরিধি বিশাল। জানা গেছে, পটুয়াখালী ও শশুর বাড়ি মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালি ইউনিয়ন কাঠালতলী গ্রামের আশে পাশের বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ফসলি জমি, একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, আধুনিক ফ্ল্যাট এবং পটুয়াখালী বাণিজ্যিক প্লট। সরকারি বেতন স্কেলের সাথে এই বিশাল বিত্ত-বৈভবের কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।দুদকের এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মো. আবদুর রব ওরফে মিন্টু মৃধা ২০০৯ সালে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে মামলার মুখে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় পিরোজপুর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে দুদকের অনুসন্ধানে তার বিপুল অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির প্রাথমিক সত্যতা মেলায় এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় বর্তমানে তাকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ওয়ান-স্ট্যান্ড বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের (Suspension) প্রক্রিয়া চলমান রেখে প্রশাসনিক সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিলা পরবর্তীতে তিনি পটুয়াখালী সদর সাব রেজিস্টার অফিসে জয়েন করেন ।
আসামি আব্দুর রব ওরফে মিন্টু মৃধা তাঁর চাকরি জীবনের অবৈধ উপার্জন আড়াল করতে স্ত্রী নাছরিন আক্তারকে ব্যবসার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। নাছরিন আক্তার নিজেকে বড় ব্যবসায়ী দাবি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবসায়িক পুঁজিতে বিনিয়োগ দেখিয়েছেন। তবে দুদক তাঁর এই কথিত ব্যবসার কোনো বৈধ লাইসেন্স, আয়কর নথির সত্যতা বা আয়ের সুনির্দিষ্ট বৈধ উৎস খুঁজে পায়নি। প্রকৃতপক্ষে স্বামীর অবৈধ টাকাই তাঁর ব্যবসার মূলধন হিসেবে খাটানো হয়েছে।
মামলার এজাহারে নাছরিন আক্তারের বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালে দুদকের নিকট দাখিলকৃত তাঁর নিজের সম্পদ বিবরণী ফরমে তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৪০৪ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব সম্পূর্ণ লুকিয়ে গেছেন। সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং তথ্য গোপন করা দুদক আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুদকের মামলার অন্যতম বড় অভিযোগ হলো মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর লঙ্ঘন। আব্দুর রব সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে কালোটাকা আয় করেছেন, সেই অর্থের প্রকৃত মালিকানা, উৎস এবং অবস্থান গোপন করার উদ্দেশ্যে টাকা এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নাছরিন আক্তার নিজের নামে ও ব্যাংক হিসাবে এই অবৈধ অর্থ গ্রহণ ও রূপান্তর করার মাধ্যমে স্বামীকে সরাসরি অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আব্দুর রবের পৈতৃক বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুর গ্রামে এবং তাঁর স্ত্রীর বাপের বাড়ি মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। আব্দুর রব ওরফে মিন্টু মৃধা পটুয়াখালী সদর, দশমিনা, গলাচিপা ও পিরোজপুরে দায়িত্ব পালনকালে এসব জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বেনামে ও আত্মীয়দের নামে মির্জাগঞ্জ উপজেলায় শ্বশুরবাড়ির এলাকায় কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল প্রাসাদ, কয়েক কোটি টাকার ফসলি জমি, শ্যালকের নামে ২০ একর বেনামি সম্পত্তি এবং নতুন ফিলিং স্টেশন তৈরির মতো বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন—তা নিয়ে সর্বত্র চলছে তুমুল সমালোচনা।
কৃষিজমি ও আবাসন সম্পত্তি কিনেছেন। মির্জাগঞ্জ এলাকায় স্ত্রীর বাপের বাড়ির সূত্র ধরে কোনো বেনামী সম্পত্তি কেনা হয়েছে কিনা, তা নিয়েও দুদকের তদন্ত দল স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল যাচাই করছে।আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা মামলাটি বর্তমানে স্পেশাল জজ আদালতের অধীনে তদন্তাধীন রয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইতিমধ্যে আসামিদের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়ী হিসাব অবরুদ্ধ (Freeze) করার আবেদন জানিয়েছেন। একই সাথে বাউফল ও পটুয়াখালীতে থাকা স্থাবর সম্পত্তিগুলো যাতে হস্তান্তর বা বিক্রি না করা যায়, সেজন্য ক্রোক (Attach) করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
এই বিষয়ে সাব রেজিস্টার মোঃ আবদুর রব ওরফে মিন্টু মৃধার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মুঠোফোনে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে বলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সেটা খুব শিঘ্রই আদালতের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে।
ক্রাইম রিপোর্টার 



















