চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলেও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ। বরং পানি সরে যাওয়ার পরই স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে হাজার হাজার পরিবার এখনও নিরাপদ আশ্রয়হীন। কোথাও বসতঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, কোথাও দেয়ালে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, আবার অনেক মাটির ঘর যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার সময় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এখন সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। অনেক পরিবার ত্রাণ পেলেও মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ ঘর পায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, স্মরণকালের এই বন্যায় বাঁশখালী উপজেলার প্রায় ৪০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জলদী পৌরসভা,কাথরিয়া, বাহারছড়া, শেখেরখীল, ছনুয়া, পুঁইছড়ি ও বৈলছড়ি ইউনিয়ন বিশেষত
বাঁশখালীর প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশ জলকদর খালের পুর্ব পাশ তথা মাধ্যম বাঁশখালীর এলাকা গুলোও উপকুলীয় এলাকার সম/বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। অনেক এলাকায় এখনো ঘরের মেঝে কাদায় ভরা, দেয়াল নরম হয়ে গেছে এবং বসবাসের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
জলদি ভাদালিয়ার এক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা বলেন, “ত্রাণে কয়েক দিনের খাবার হয়েছে, কিন্তু ঘর ভেঙে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
আরেক কৃষক জানান, “জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, ঘরের ক্ষতি হয়েছে, মাছের ঘের ভেসে গেছে। এখন কাজও নেই, ঘরও নেই।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক পরিবার এখনও আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থান করছে। মাটির ঘরের ভিত্তি নরম হয়ে যাওয়ায় অনেকেই নিজের ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। বিভিন্ন এলাকায় ভাঙা সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত কালভার্ট ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতির কারণে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষকের ফসল, মাছচাষিদের ঘের এবং ক্ষুদ্র খামারিদের গবাদিপশুর ক্ষতির ফলে অনেক পরিবার আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়েছে। ফলে খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি জীবিকা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে টিন, বাঁশ, কাঠ, ইট, সিমেন্ট, রড, ঢেউটিন ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সরকারি কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন ঋণের ব্যবস্থাও জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার সময় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছালেও পানি নেমে যাওয়ার পর পুনর্বাসন নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে হাজারো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটে পড়বে।
বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত মানুষের এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া—কয়েক দিনের খাদ্য সহায়তা নয়, বরং একটি নিরাপদ ঘর, জীবিকা ফিরে পাওয়ার সুযোগ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কার্যকর পুনর্বাসন। কারণ, পানি নেমে গেলেও তাদের জীবনের ক্ষত এখনো শুকায়নি।
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী 



















