কবে কখন বালু নদের তীরে প্রথম হাট বসেছিল, সেটা কারো জানা না থাকলেও প্রবীনরা বলেন, বাপ দাদাগো কাছে শুনেছি ব্রিটিশ আমলে জমিদাররা তাদের পরগণা দেখার পর বালুনদের তীরে বসে বিশ্রাম নিতেন| স্থানীয় কৃষকরা তখন বিভিন্ন পণ্য নিয়ে তাদের কাছে বিক্রির জন্য আসতেন| তখন থেকেই হাটের প্রচলন বলে বয়োবৃদ্ধরা ধারনা করেন| কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বরুনা এলাকার রমা কান্ত, কৃষ্ণ কান্তরা হাটের জন্য জমি দান করেন| ১৭৫৭ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পরে রমা কান্তরা দেশ ছেড়ে চলে যান| এরপর থেকে কায়েতপাড়া হাট নামেই এখনও পরিচিত|
রামপুরা থেকে একটি পাকা সড়ক পূর্ব দিকে চলে গেছে| সড়ক ধরে কিছুটা দূর এগোলে আরেকটি মোড়| এই মোড় থেকে বালু নদের তীর ঘেঁষে কায়েতপাড়া হাট| এখানে হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন—শনি ও বৃহস্পতিবার| সকালে বেচাকেনা শুরু হয়, চলে রাত পর্যন্ত| অন্য দিনগুলোতে নিয়মিত বাজার বসে| রামপুরা, মাদারটেক, বাসাবসহ রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এই হাটে আসেন|
নদের তীরে বিশাল বটগাছ| বটগাছের ডালগুলো মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে| নিচে বটের শীতল ছায়া| এই ছায়ায় বসেছে হাট| হাটের নাম কায়েতপাড়া| রূপগঞ্জ উপজেলার বালু নদের তীরের এই হাটের বয়স ৪০০ বছরের বেশি| আগের মতো জৌলুশ না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী এই হাট এখনো বেচাকেনায় সরগরম হয়ে ওঠে|
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটা সময় বালু প্রমত্তা ছিল| নদ দিয়ে বজরা নৌকা নিয়ে ব্যবসায়ীরা এই হাটে আসতেন| হাট থেকে ধান, পাট, গুড়, পাটালি, কাঁঠাল কিনে নৌকায় করে তাঁরা ফিরে যেতেন| প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদের ঘাটে বাঁধা থাকত অসংখ্য নৌকা|
শনিবার দুপুরে হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাঠের প্রায় মাঝখানে বিশাল বটগাছ| বটগাছের দুই পাশে গলি| গলির দুই পাশে সারি সারি ছোট-বড় টিনের ও কাঠের দোকানঘর| বেশির ভাগ দোকানঘর জরাজীর্ণ| বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো| ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল টানিয়েও বসেছে অস্থায়ী দোকান| চলছে বেচাকেনা| ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে দেখছেন| কেউ কেউ দোকানির সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন|
হাটে এসেছেন অশীতিপর আউয়াল আলী (৮৫)| তাঁর বাড়ি উপজেলার খামারপাড়া গ্রামে| তিনি হাট থেকে কাঠাল কিনবেন| তিনি বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকে এই হাটে আসছি| সেই থেকে দেখেছি এখানকার হাটে বাইরের জেলার লোক আসত পাট, ধান, কাঁঠাল কিনতে| এই হাট ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র হাট| বটগাছটা অনেক পুরোনো| এই হাটের বয়স ৪০০ বছরের বেশি হবে|’
হাটে এসেছেন প্রবীণ পাল (৪৬)| তিনি বাড়িতে ˆতরি মাটির ˆতজসপত্র নিয়ে হাটে এসেছেন| সেগুলো বিক্রি করে তিনি সবজি আর মাছ কিনবেন| তিনি বলেন, বাবা-ঠাকুরদারা এই হাটে আসতেন| অনেক বছর ধরে এখানে নদের তীরে বটগাছের নিচে হাট চলে আসছে|
বটগাছের নিচে খোলা জায়গায় আম কাঁঠাল বিক্রি করছিলেন বাবুল খান (৫৫)| কথা হয় তাঁর সঙ্গে| তিনি বলেন, ‘বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি, এই হাটে অনেক দূর থেকে লোকজন আসত| তারা মূলত এখানকার পাট, ধান, শর্ষে, কাঁঠাল এবং খেজুরের গুড় ও পাটালি কেনার জন্য বড় বড় নৌকা নিয়ে আসত| ধান ও পাট কিনে নৌকা বোঝাই দিয়ে আবার ফিরে যেত|’
৬০ বছর ধরে হাটে চানাচুর বিক্রি করেন রশিদ (৮০)| তিনি বলেন, ‘সপ্তাহের দুই দিন নিয়মিত হাট করি| সকাল থেকে হাট শুরু হয়| তবে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকজন হাট করতে আসেন| হাটটি আগেও যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে| তবে আশপাশে অনেকগুলো হাট হয়ে গেছে এবং নদ প্রায় মরে যাওয়াযর উপক্রম হয়েছে| এখন হাটে লোকসমাগম অনেক কমে গেছে|’
কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ্যাড. গোলজার হোসেন বলেন, ‘ হাটটি ঐতিহ্যবাহী ও সুপ্রাচীন| ব্রিটিশ আমলে নদের তীরে এ হাট গড়ে ওঠে| এ হাটে পাট, গুড় ও মাছের জন্য সেই সময় থেকে বিখ্যাত| বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি, তাঁরা বহুকাল ধরে এই হাটে বেচাকেনা করেছেন|
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ 



















