বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সদর ইউনিয়নের প্রফেসারপাড়া এলাকায় একটি মাছের ঘেরের ওপর স্থাপিত বাণিজ্যিক ব্রয়লার (পোল্ট্রি) খামারকে কেন্দ্র করে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খামার থেকে নির্গত মুরগির বিষ্ঠা, বর্জ্য ও তীব্র দুর্গন্ধের কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খামার থেকে প্রতিদিন মুরগির বিষ্ঠা, মৃত মুরগি ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি মাছের ঘেরে ফেলা হচ্ছে। এতে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি জৈব বর্জ্য পচে অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পুরো এলাকায় অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা, খাওয়া-দাওয়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত পোল্ট্রি খামারের কারণে যেসব স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাব: দীর্ঘসময় দুর্গন্ধ ও অ্যামোনিয়া গ্যাসের সংস্পর্শে থাকলে চোখ ও নাকে জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পানি দূষণ: মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্য সরাসরি জলাশয়ে পড়লে পানির অক্সিজেন কমে যায়, জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয় এবং রোগজীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে।
মশা ও মাছির উপদ্রব: অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে মশা-মাছির বংশবিস্তার বেড়ে গিয়ে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রোগজীবাণুর বিস্তার: সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার ও ই. কোলাইয়ের মতো জীবাণু বর্জ্যের মাধ্যমে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, যা খাদ্য ও পানিবাহিত রোগের কারণ হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: দূষিত পরিবেশে বসবাসের ফলে শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ: অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দুর্গন্ধজনিত মানসিক ও সামাজিক প্রভাব: দীর্ঘদিন তীব্র দুর্গন্ধে বসবাস মানুষের মানসিক চাপ, অস্বস্তি এবং জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে খামারের মালিক নুর ইসলাম শেখের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা হলেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো খামারের বর্জ্য এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে যাতে পরিবেশ, পানি, মাটি ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
এলাকাবাসী পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, পরিবেশগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সচেতন মহলের মতে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও বড় পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
রামপালে মাছের ঘেরের ওপর পোল্ট্রি খামার , পরিবেশ দূষণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি; দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
-
আরিফ হাসান গজনবী রামপাল (বাগেরহাট) প্রতিনিধি - আপডেট সময় : ০৩:০৭:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
- 54
জনপ্রিয় সংবাদ




















