ঢাকা ০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে ভয়াবহ নদীভাঙন, ঘরবাড়ি হারাচ্ছে শতাধিক পরিবার বন্যার শঙ্কায় বাড়ছে আতঙ্ক, স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি

উজানের ঢল এবং নদ-নদীর পানি ওঠানামার প্রভাবে কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। এর মধ্যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস থাকায় নদীতীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী ও রাজারহাটসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৪০টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
বিশেষ করে চরবড়াই বাড়ি এলাকায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। ফলে এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনই নদী তাদের স্বপ্ন, বসতভিটা ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন গ্রাস করছে। তারা জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে ব্লক বা পাইলিং নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নবির হোসেন (ডিপজল) বলেন, “প্রতিদিন ঘুম ভাঙে নদীর গর্জনের শব্দে। রাতে ঘুমাতে যাই এই দুশ্চিন্তা নিয়ে—সকালে ঘরটা থাকবে কি না। আমরা কোনো বিলাসিতা চাই না, শুধু মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষার ব্যবস্থা চাই।”
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লেবু মিয়া বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে দুধকুমার নদের ভাঙনে এ এলাকার অসংখ্য মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে। এখন পুরো গ্রাম হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্কুল, হাট ও বিজিবি ক্যাম্পও ঝুঁকিতে পড়বে।
একই এলাকার শাহিনা বেগম বলেন, “নদী ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির একেবারে কাছে চলে এসেছে। ঘর সরিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু এরপর কোথায় যাব জানি না। আমাদের আর কোনো জায়গা-জমি নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙন এখন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে দশবার পর্যন্ত বসতভিটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এবার শেষ সম্বলটুকু হারালে তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, জেলার ৪০টি ভাঙনকবলিত পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ৪ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অথবা বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি নদীভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে পাঁচটি প্রধান নদীর দুই তীর মিলিয়ে প্রায় ৩৭৪ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে মাত্র ৬৬ কিলোমিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “নদ-নদীর পানি বাড়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের দাবি, প্রতিবছর অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা হোক।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

কুড়িগ্রামে ভয়াবহ নদীভাঙন, ঘরবাড়ি হারাচ্ছে শতাধিক পরিবার বন্যার শঙ্কায় বাড়ছে আতঙ্ক, স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি

আপডেট সময় : ০২:১৬:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

উজানের ঢল এবং নদ-নদীর পানি ওঠানামার প্রভাবে কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। এর মধ্যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস থাকায় নদীতীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী ও রাজারহাটসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৪০টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
বিশেষ করে চরবড়াই বাড়ি এলাকায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। ফলে এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনই নদী তাদের স্বপ্ন, বসতভিটা ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন গ্রাস করছে। তারা জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে ব্লক বা পাইলিং নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নবির হোসেন (ডিপজল) বলেন, “প্রতিদিন ঘুম ভাঙে নদীর গর্জনের শব্দে। রাতে ঘুমাতে যাই এই দুশ্চিন্তা নিয়ে—সকালে ঘরটা থাকবে কি না। আমরা কোনো বিলাসিতা চাই না, শুধু মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষার ব্যবস্থা চাই।”
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লেবু মিয়া বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে দুধকুমার নদের ভাঙনে এ এলাকার অসংখ্য মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে। এখন পুরো গ্রাম হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্কুল, হাট ও বিজিবি ক্যাম্পও ঝুঁকিতে পড়বে।
একই এলাকার শাহিনা বেগম বলেন, “নদী ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির একেবারে কাছে চলে এসেছে। ঘর সরিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু এরপর কোথায় যাব জানি না। আমাদের আর কোনো জায়গা-জমি নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙন এখন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে দশবার পর্যন্ত বসতভিটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এবার শেষ সম্বলটুকু হারালে তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, জেলার ৪০টি ভাঙনকবলিত পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ৪ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অথবা বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি নদীভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে পাঁচটি প্রধান নদীর দুই তীর মিলিয়ে প্রায় ৩৭৪ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে মাত্র ৬৬ কিলোমিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “নদ-নদীর পানি বাড়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের দাবি, প্রতিবছর অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা হোক।