ঢাকা ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনাফে পৈতৃক জমি নিয়ে দু’পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রবীণসহ আহত ৩: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২

 

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদার পাড়া স্টেশন এলাকায় পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা ও মাটি ভরাটকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ঘটনার শিকার দু’পক্ষের দুইজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাহারছড়া দক্ষিণ শিলখালী ৪নং ওয়ার্ডের চৌকিদার পাড়া স্টেশনের পশ্চিম পাশে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সৈয়দুর রহমানের মালিকানাধীন জমি রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলীয় এই সম্পত্তি এবং বাইরে থেকে কেনা আরও কিছু জমি তাঁর দুই পুত্র—সৌদি প্রবাসী আব্দুল কাদের ও বড় পুত্র আব্দুল মান্নানকে ‘হেবা’ (দান) করে দেন। দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গা ভোগদখল করে আসছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে, গত কাল সকাল ৯টার দিকে তাদেরই নিকটাত্মীয় সলিম উল্লাহ, আব্দুল গফুর, নাজমুল্লাহ, শহীদ উল্লাহ, রবিউল্লাহ, আরিফ উল্লাহ, আব্দুল জব্বার ও আব্দুল মজিদসহ একদল লোক আকস্মিকভাবে ওই জমিতে মাটি ভরাট শুরু করে। খবর পেয়ে বৃদ্ধ সৈয়দুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দিলে প্রতিপক্ষ তাঁর ওপর হামলা চালায়। বাবার ওপর হামলার খবর পেয়ে দুই পুত্র ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৈয়দুর রহমানের বড় পুত্র আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার বাবা সবসময় তাঁর এই ভাতিজাদের বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহযোগিতা করে এসেছেন। কিন্তু তারা অন্যায় ও অমানবিকভাবে আমার বৃদ্ধ বাবার ওপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেছে। আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।” এ ঘটনায় বৃদ্ধ সৈয়দুর রহমানের শরীরেও লাঠির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনার পর পরই সৈয়দুর রহমান বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন এবং প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় পক্ষের পাল্টা দাবি
এদিকে ঘটনার বিষয়ে দ্বিতীয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন। তাদের মতে, ওই জমির প্রকৃত মালিক তারা।
দ্বিতীয় পক্ষের দাবি, “এই জায়গাটি আমাদের। সৈয়দুর রহমান গংরা দীর্ঘ বছর ধরে জোরপূর্বক আমাদের জায়গা দখল করে খাচ্ছে। আমরা বহুবার কাগজপত্র নিয়ে বসার চেষ্টা করলেও তারা স্থানীয় বিচার-শালিস অমান্য করে আসছে। নিরুপায় হয়ে আমরা আমাদের নিজেদের জায়গায় মাটি ভরাট করতে গেলে তারা আমাদের ওপর বাধা সৃষ্টি করে।”
তারা আরও দাবি করেন, বাধা দেওয়ার একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে এবং প্রথম পক্ষের আঘাতে আনোয়ারা নামের একজন হাতে জখম হন। এছাড়া আব্দুল গফুরের মাথায় দা দিয়ে আঘাত করা হলে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় দ্বিতীয় পক্ষও টেকনাফ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে এবং প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংঘর্ষে প্রবীণ মোখলেসুর রহমানের শরীরেও লাঠির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে চৌকিদার পাড়া ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) হাফেজ আহমদ বলেন, “জায়গা-সম্পত্তি মারামারি করে পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে বসে সমাধান করার বিষয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিনও একই মত প্রকাশ করে বলেন, দু’পক্ষেরই মারামারি পরিহার করে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বসে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসা উচিত ছিল।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসান জানান, “বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
‘দৈনিক বাংলার সংবাদ’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জমি সংক্রান্ত এই বিরোধের জেরে উভয় পক্ষই কম-বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রশাসন যেন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

টেকনাফে পৈতৃক জমি নিয়ে দু’পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রবীণসহ আহত ৩: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২

আপডেট সময় : ০৪:০৫:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

 

টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদার পাড়া স্টেশন এলাকায় পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা ও মাটি ভরাটকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ঘটনার শিকার দু’পক্ষের দুইজন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাহারছড়া দক্ষিণ শিলখালী ৪নং ওয়ার্ডের চৌকিদার পাড়া স্টেশনের পশ্চিম পাশে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সৈয়দুর রহমানের মালিকানাধীন জমি রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলীয় এই সম্পত্তি এবং বাইরে থেকে কেনা আরও কিছু জমি তাঁর দুই পুত্র—সৌদি প্রবাসী আব্দুল কাদের ও বড় পুত্র আব্দুল মান্নানকে ‘হেবা’ (দান) করে দেন। দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গা ভোগদখল করে আসছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে, গত কাল সকাল ৯টার দিকে তাদেরই নিকটাত্মীয় সলিম উল্লাহ, আব্দুল গফুর, নাজমুল্লাহ, শহীদ উল্লাহ, রবিউল্লাহ, আরিফ উল্লাহ, আব্দুল জব্বার ও আব্দুল মজিদসহ একদল লোক আকস্মিকভাবে ওই জমিতে মাটি ভরাট শুরু করে। খবর পেয়ে বৃদ্ধ সৈয়দুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দিলে প্রতিপক্ষ তাঁর ওপর হামলা চালায়। বাবার ওপর হামলার খবর পেয়ে দুই পুত্র ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৈয়দুর রহমানের বড় পুত্র আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার বাবা সবসময় তাঁর এই ভাতিজাদের বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহযোগিতা করে এসেছেন। কিন্তু তারা অন্যায় ও অমানবিকভাবে আমার বৃদ্ধ বাবার ওপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেছে। আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।” এ ঘটনায় বৃদ্ধ সৈয়দুর রহমানের শরীরেও লাঠির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনার পর পরই সৈয়দুর রহমান বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন এবং প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় পক্ষের পাল্টা দাবি
এদিকে ঘটনার বিষয়ে দ্বিতীয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন। তাদের মতে, ওই জমির প্রকৃত মালিক তারা।
দ্বিতীয় পক্ষের দাবি, “এই জায়গাটি আমাদের। সৈয়দুর রহমান গংরা দীর্ঘ বছর ধরে জোরপূর্বক আমাদের জায়গা দখল করে খাচ্ছে। আমরা বহুবার কাগজপত্র নিয়ে বসার চেষ্টা করলেও তারা স্থানীয় বিচার-শালিস অমান্য করে আসছে। নিরুপায় হয়ে আমরা আমাদের নিজেদের জায়গায় মাটি ভরাট করতে গেলে তারা আমাদের ওপর বাধা সৃষ্টি করে।”
তারা আরও দাবি করেন, বাধা দেওয়ার একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে এবং প্রথম পক্ষের আঘাতে আনোয়ারা নামের একজন হাতে জখম হন। এছাড়া আব্দুল গফুরের মাথায় দা দিয়ে আঘাত করা হলে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় দ্বিতীয় পক্ষও টেকনাফ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে এবং প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংঘর্ষে প্রবীণ মোখলেসুর রহমানের শরীরেও লাঠির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে চৌকিদার পাড়া ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) হাফেজ আহমদ বলেন, “জায়গা-সম্পত্তি মারামারি করে পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে বসে সমাধান করার বিষয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিনও একই মত প্রকাশ করে বলেন, দু’পক্ষেরই মারামারি পরিহার করে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বসে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসা উচিত ছিল।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসান জানান, “বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
‘দৈনিক বাংলার সংবাদ’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জমি সংক্রান্ত এই বিরোধের জেরে উভয় পক্ষই কম-বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রশাসন যেন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করে।