যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গদখালী রেলস্টেশন দীর্ঘ ৫ দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এক সময় এ স্টেশনটি ছিল এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। বর্তমানে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গদখালী-পানিসারা এলাকার মানুষের যোগাযোগ, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে বন্ধ থাকা এই রেলস্টেশন পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধান করতে গিয়ে গদখালী এলাকার স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল ভক্ত দৈনিক বাংলার সংবাদকে জানান, “১৮১৬ সালে তৎকালীন গদখালীর জমিদার নওয়াবাবুর একান্ত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় এবং গোবরডাঙ্গা জমিদার নওয়াবাবুর শ্বশুরের মাধ্যমে ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ের জমিতে স্থাপন করা হয় গদখালী রেলস্টেশন। সে সময় এর নাম ছিল ‘Godkhali Station’।”
তিনি আরও জানান, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই রেলস্টেশন দীর্ঘদিন মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর থেকে স্টেশনটি বন্ধ রয়েছে।
তবে বর্তমানে স্টেশনটি বন্ধ থাকলেও রেলপথের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রেলওয়ের গেট কিপারের জন্য সেখানে একটি কক্ষ রয়েছে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অবস্থান করে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সহযোগিতা করে থাকেন। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গদখালী এলাকার এই গেটটির নম্বর E/18, Class- “B”, KM 74/6-8।
বর্তমানে গদখালী শুধু যশোর নয়, সারা বাংলাদেশের কাছে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার পানিসারা ও আশপাশের অঞ্চলের কয়েকশ’ ফুলচাষি কৃষক ফুল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের উৎপাদিত ফুল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং দেশের বাইরেও রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী গদখালী ও পানিসারার ফুলের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। কিন্তু রেলস্টেশন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ, ফুলচাষি, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গদখালী রেলস্টেশন পুনরায় চালু হলে এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন সহজ হবে, তেমনি ফুলচাষিদের উৎপাদিত ফুল দ্রুত ও সহজে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির আরও উন্নয়ন ঘটবে।
গদখালী রেলস্টেশন পুনরায় চালুর দাবির বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। জাতীয় সংসদের ৩১৪ সংরক্ষিত মহিলা আসনের (মহিলা আসন-১৪) সংসদ সদস্য মোছা. সাবিরা নাজমুল মুন্নি বলেন, “গদখালী এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করা হবে, যাতে দ্রুত এই রেলস্টেশন চালুর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।”
যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোসলে উদ্দিন ফরিদ বলেন, “গদখালী রেলস্টেশন চালুর দাবি এলাকার মানুষের যৌক্তিক দাবি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হবে, যাতে এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়।”
স্থানীয় জনগণ জানান, বর্তমানে তারা এলাকার উন্নয়নের জন্য দুইজন জাতীয় সংসদ সদস্য পেয়েছেন। তাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে বন্ধ হয়ে থাকা গদখালী রেলস্টেশন পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়েছে। এলাকাবাসী আশাবাদী, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উদ্যোগে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী এই রেলস্টেশনটি আবার চালু হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গদখালী রেলস্টেশনটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এতে গদখালী-পানিসারা ফুল চাষের সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে, সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
আবু রাসেল স্টাফ রিপোর্টার দৈনিক বাংলার সংবাদ 



















