ঢাকা ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ ভাড়া নিয়ে অচলাবস্থা, বন্ধ ছয় কোল্ড স্টোরেজের কার্যক্রম

কুড়িগ্রামে আলু সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের মধ্যে চলমান বিরোধের জেরে জেলার ছয়টি কোল্ড স্টোরেজে (হিমাগার) গত ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে আলু সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলতে থাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী এবং হিমাগার মালিক—সব পক্ষই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
জেলা আলুচাষি ও আলু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা জানান, সরকার নির্ধারিত আলু সংরক্ষণ ভাড়া প্রতি কেজি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হলেও তাঁরা ভাড়া কমিয়ে ৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। এ দাবিতে তাঁরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন এবং জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। তাঁদের মতে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারে আলুর দামের অনিশ্চয়তার কারণে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সংরক্ষণ ভাড়া কমানো জরুরি।
অন্যদিকে কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মোস্তফা কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাঁরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি বলেন, “সরকার চাইলে ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষক ও হিমাগার—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে এ সংকটের কার্যকর সমাধান করতে পারে।”

বাবর কোল্ড স্টোরেজ (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান কবির রাজীদ বলেন, তাঁরা সবসময় সরকারি আইন ও নির্দেশনা মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখতে চান। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “মালিকপক্ষ কখনোই কৃষকদের বিপক্ষে নয়। বরং কৃষক বাঁচলে কোল্ড স্টোরেজও টিকে থাকবে। কিন্তু লোকসান গুনে কোনো শিল্প দীর্ঘদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংরক্ষণ ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না করলে কোল্ড স্টোরেজ শিল্পই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।”
রায়হান কবির রাজীদ আরও বলেন, “সরকার, কৃষক, ব্যবসায়ী ও মালিক—সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন, কারণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাবে।”
সেকেন্দার কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের মালিক সেকেন্দার বলেন, ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মালিকপক্ষও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হচ্ছে, তার দায়ভার কে নেবে?
হক কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল আহমেদ বলেন, কৃষকদের সহযোগিতা করেই তাঁরা দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কৃষক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব।
এদিকে স্বনির্ভর আলু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি দুলাল বেপারী বলেন, জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, কৃষকের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত এই অচলাবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
জেলার কৃষক, ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না হলে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণে সংকট তৈরি হবে, অন্যদিকে হিমাগার মালিকদেরও কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূল্লীতে জমি দখলের পাঁয়তারা, ধান ও মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগ

কুড়িগ্রামে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ ভাড়া নিয়ে অচলাবস্থা, বন্ধ ছয় কোল্ড স্টোরেজের কার্যক্রম

আপডেট সময় : ১০:২৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

কুড়িগ্রামে আলু সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আলুচাষি, ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের মধ্যে চলমান বিরোধের জেরে জেলার ছয়টি কোল্ড স্টোরেজে (হিমাগার) গত ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে আলু সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলতে থাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী এবং হিমাগার মালিক—সব পক্ষই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
জেলা আলুচাষি ও আলু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা জানান, সরকার নির্ধারিত আলু সংরক্ষণ ভাড়া প্রতি কেজি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হলেও তাঁরা ভাড়া কমিয়ে ৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। এ দাবিতে তাঁরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন এবং জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। তাঁদের মতে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারে আলুর দামের অনিশ্চয়তার কারণে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সংরক্ষণ ভাড়া কমানো জরুরি।
অন্যদিকে কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মোস্তফা কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাঁরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি বলেন, “সরকার চাইলে ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষক ও হিমাগার—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে এ সংকটের কার্যকর সমাধান করতে পারে।”

বাবর কোল্ড স্টোরেজ (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান কবির রাজীদ বলেন, তাঁরা সবসময় সরকারি আইন ও নির্দেশনা মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখতে চান। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “মালিকপক্ষ কখনোই কৃষকদের বিপক্ষে নয়। বরং কৃষক বাঁচলে কোল্ড স্টোরেজও টিকে থাকবে। কিন্তু লোকসান গুনে কোনো শিল্প দীর্ঘদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংরক্ষণ ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না করলে কোল্ড স্টোরেজ শিল্পই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।”
রায়হান কবির রাজীদ আরও বলেন, “সরকার, কৃষক, ব্যবসায়ী ও মালিক—সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন, কারণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাবে।”
সেকেন্দার কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের মালিক সেকেন্দার বলেন, ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মালিকপক্ষও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হচ্ছে, তার দায়ভার কে নেবে?
হক কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল আহমেদ বলেন, কৃষকদের সহযোগিতা করেই তাঁরা দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কৃষক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা সম্ভব।
এদিকে স্বনির্ভর আলু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি দুলাল বেপারী বলেন, জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, কৃষকের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত এই অচলাবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
জেলার কৃষক, ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না হলে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণে সংকট তৈরি হবে, অন্যদিকে হিমাগার মালিকদেরও কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।